বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিবিষয়ক এক পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'অধিকার' আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন দুটি পাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলতে পারি, গত কয়েক মাসের সরকারে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।’
মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন এখনো সংসদে না ওঠায় ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিল দুটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর সংসদে তোলা হবে জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আশার কথা শোনাতে পারি, দুইটা (ওই দুটি) আইনের ফাইনাল আমরা তিন স্টেজে কনসালটেশন করেছি।…দুইটা আইন আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে ক্যাবিনেট কমিটিতে পাঠিয়েছি। কমিটি এটা দেখে ক্যাবিনেটে উঠবে। আশা করছি, পরবর্তী ক্যাবিনেটে—এই দুইটা আইনে আমরা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়ে পার্লামেন্টে নিয়ে যাব।’
সহকারী জজদের বদলি ও শাস্তির ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় শুধু সুপারিশ করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় চৌদ্দ শ নিম্ন আদালতের বিচারককে বদলি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে যাঁরা মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। যখন সেগুলো ঠিক করতে গেছি, সেখান থেকে ৭০ পারসেন্ট আমাদেরকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এ রকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যাচ্ছে।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যদি মনে করেন, সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, আমি বিনয়ের সাথে বলব, এটা সরকারের বিষয় না। সরকার যখন পার্টি ক্যাডারকে বসায় দেয় এবং এই জজ সাহেব যখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারেন, তখনই বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে।’
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে মো. আসাদুজ্জামান মন্তব্য করেন যে, বিগত ১৬–১৭ বছর সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সঠিকভাবে সফল হয়নি। তাঁর মতে, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য বিচারক নিয়োগ দিলেই একটি স্বাধীন ও প্রত্যাশিত বিচার বিভাগ পাওয়া সম্ভব, যা কেবল কাগজে-কলমে লিখে পাওয়া যাবে না। এছাড়া ধর্ষণের মামলার বিষয়ে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আরেকটা জায়গা খুব রশি টেনে ধরেছি। ধর্ষণের মামলা এলে সেই মামলা আমরা প্রত্যাহারের তালিকায় রাখব না। যত বড় রাজনৈতিক মামলাই হোক না কেন, সেটা আমাদের আরেকটা কমিটমেন্টের জায়গা।’
অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারপারসন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নির্যাতন প্রতিরোধ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এর জন্য সরকারি সংস্থা, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সুশীল সমাজের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। গুমকে মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা প্রশাসনের সময় অনেক আইনপ্রয়োগকারী এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে অমানবিক ও দানবীয় করে তোলা হয়েছিল। সেই শাসনামলে কৌশলগত, নির্বাহী ও কার্যকরী—এই তিন স্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে গুম সংঘটিত হয়েছিল।
২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অগ্রগতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তে দেখা গেছে অধিকারের প্রতিবেদন সঠিক ছিল। তিনি বলেন, ‘তদন্তের পর দেখলাম যে অধিকার যে রিপোর্ট দিয়েছিল—৬১ জন এবং ৬১ জনের রিপোর্টটি সঠিক। সেখানে আমরা ৫৮ জনের নাম-পরিচয় পেয়েছি। বাকি তিনজন এখনো পাইনি। হয়তো সেটা মামলা চলাকালীন পেয়ে যেতে পারি।’ আগামী সোমবার ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করবেন তিনি, যার মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে।
অনুষ্ঠানে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি যাতে আবার আওয়ামী লীগ না হয়ে যায়, সে জন্য দু-তিনটে কাজ আমাদের করতে হবে। একটা কাজ করতে হবে—বিচার করতে হবে। যারা অপরাধী, তাদের বিচার করতে হবে।’ প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণের দাবি ও সরকারের যুক্তিসঙ্গত সমালোচনার ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো তারা যেন ভুলে না যায় যে ১৭ বছর এই সরকারের লোকজনও ভিকটিম ছিলেন।
অধিকারের প্রেসিডেন্ট তাসনিম সিদ্দিকী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান এবং মো. আমিনুল ইসলাম। সূচনা বক্তব্য দেন অধিকারের সমন্বয়ক কোরবান আলী।