বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার বিষয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে বলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সহিংসতা বা অগ্নিসংযোগ করলেই কি প্রকৃত বিরোধিতা হয়?

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) থ্রিডি হলে ‘জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পেশাজীবীদের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা ও জুলাই ডকুমেন্টারি পরিবেশনার অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাগ্রিকালচারিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘অনেকে বলে পার্লামেন্টে (সংসদে) বিরোধী দল কিচ্ছু করতেছে না, কুসুম কুসুম বিরোধিতা করতেছে।…আমি তাদের বলি, কুসুম কুসুম না করে গরম গরম মানে কি ১০টা গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ধর্মঘট করলে আসল বিরোধিতা হতো, তাই না?’

দলটির অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আমরা পার্লামেন্টে দায়িত্বশীল এবং গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। সকল ভালো কাজে আমরা সাহায্য করব, সকল মন্দ কাজ, জনস্বার্থবিরোধী কাজে আমরা বিরোধিতা করব।’

অনুষ্ঠানে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসে অভ্যুত্থানের মূল দর্শন থেকে দূরে সরে গেছে। তিনি বলেন, যে সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ১৭ বছর দুর্নীতি, লুটপাট, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন এবং দলীয়করণ করেছিল, সেই সংবিধানকে পরিবর্তন করে একটা নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য সবাই রাজি হয়েছিল। বিএনপি সেই জায়গা থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের কথা বলে সরকার দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে বলে দাবি করেন তিনি। জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেলের মতে, বিএনপি জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার কথা বললেও ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ১২ থেকে ১৪টি প্রস্তাবে তারা ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়েছে। তিনি বলেন, এগুলো মেনে নিলে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি নষ্ট হয়ে যাবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, গণভোটে পাঁচ কোটি ভোটার সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত খারিজ করে দিয়েছেন। এখন ‘অক্ষরে অক্ষরে মানার’ অর্থ হলো ভিন্নমতের প্রস্তাবগুলো বাদ দিয়ে জুলাই সনদে যা থাকবে, কেবল সেগুলোই তারা মানবে।

সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সাংবিধানিক সব পদে যদি প্রধানমন্ত্রীর এই অসীম ক্ষমতা কাজে লাগে, উচ্চকক্ষেও যদি সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, গুরুত্বপূর্ণ সব সাংবিধানিক কাঠামোগত পরিবর্তনে যদি ভিন্নমত থাকে; তাহলে এই সংবিধানের কোনো গুণগত পরিবর্তন হবে না। এর মধ্য দিয়ে যাঁরাই প্রধানমন্ত্রী হবেন, শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিবাদ হিসেবে তাঁদের জন্ম হবে।

সরকারি দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ট্রেন মিস করেছেন। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডাকার কথা ছিল, আপনারা ডাকেননি। আইন লঙ্ঘন করেছেন।… ট্রেন যখন মিস করেছেন, প্রথম স্টেশনে উঠতে পারেন নাই; তো মাঝের স্টেশনে ট্রেনে উঠে গন্তব্যে যাওয়া যায় কি না দেখেন। পার্লামেন্টে প্রস্তাব দিন, ডিসকাস (আলোচনা) হোক। জাতি সংঘাত-সহিংসতা থেকে বাঁচুক।’

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমান, আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, ডাকসু সহসভাপতি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ সাফওয়ান আখতারের বাবা মো. আক্তারুজ্জামান লিটন। সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যাগ্রিকালচারিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক এ টি এম মাহবুব-ই-ইলাহী তাওহীদ।