সাভারের ঐতিহ্যবাহী মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ সভাপতি পদে পরিবর্তন এনেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো ধরনের অভিযোগ বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সাবেক সভাপতিকে সরিয়ে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর স্ত্রী সাবিনা সিদ্দিকা রিতাকে নতুন সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মেয়াদের মাঝপথে এই রদবদলকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুটি পৃথক চিঠির মাধ্যমে এই কমিটি গঠন ও পরবর্তীতে পরিবর্তন আনা হয়। প্রথম চিঠিতে দেখা যায় গত ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কলেজ পরিদর্শক মো. আবদুল হাই সিদ্দিক সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে দুই বছর মেয়াদের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খানকে সভাপতি এবং অধ্যাপক ড. ফকির রফিকুল আলমকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তী দ্বিতীয় চিঠিতে দেখা যায় আগের চিঠির দুই বছরের মেয়াদের প্রায় আট মাস বাকি থাকতেই গত ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত অপর এক চিঠিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়। চিঠিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ সংবিধির ৭ নং ধারার ক্ষমতাবলে সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিন খানের স্থলে এমপি-পত্নী সাবিনা সিদ্দিকা ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদে শিরিন আফরোজকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরিবর্তিত এই কমিটির মেয়াদ ধরা হয়েছে আগামী ২৩ এপ্রিল ২০২৭ পর্যন্ত।
হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সদ্য সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ম মেনে তাদের দুই বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়েছিল। সফলভাবে এডহক কমিটির দায়িত্ব পালন শেষে তারা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছিলেন।
ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, মেয়াদের আট মাস বাকি থাকতেই কোনো প্রকার অবহিতকরণ বা নোটিশ ছাড়া সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নতুন সভাপতি মনোনয়ন আনা হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়া মেয়াদের মাঝপথে এভাবে সরানো হবে তা ভাবতেও পারিনি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে মধ্যবর্তী সময়ে বসানোর এই প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা ছাড়া মেয়াদের আগেই এভাবে কমিটি বদলে ফেলার কারণে কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে মনে করি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতি না থাকাই ভালো।
কলেজের অধ্যক্ষ এস এম এ জামানকে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কলেজের অফিস সহকারী আব্দুর রাজ্জাক জানান, তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবর্তন সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছেন এবং বর্তমানে নতুন সভাপতি দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে সভাপতি মনোনয়নের বিষয়টি সরাসরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা হয় বলে এর পেছনের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
এদিকে নবনিযুক্ত সভাপতি সাবিনা সিদ্দিকা রিতা জানান, প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও নারী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তিনি নিজেই আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিধি মোতাবেক তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে।
স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এলাকায় নারী শিক্ষার আলো ছড়াতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজ। দীর্ঘদিনের সুপরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে মেয়াদের মাঝপথে হঠাৎ এমন রদবদলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।