প্রতি বর্ষায় দুই-তিন ঘণ্টা টানা বৃষ্টি নামলেই যশোর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো জলাশয়ে রূপ নেয়। দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের লোকসান, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আর অফিসগামী মানুষের কোমরসমান পানি পেরিয়ে পথচলা এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। অথচ, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান।

যশোর পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ দুই অর্থবছরে ২৪৭ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আরও প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই খরচের হিসাবের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।

সম্প্রতি কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণেই টিবি ক্লিনিক এলাকা, খড়কি শাহ আব্দুল করিম সড়ক, আপন মোড়, রূপকথা মোড়, ধর্মতলা, চারখাম্বা, মুজিব সড়কের রেলগেট, নাজির শংকরপুর, বেজপাড়া চিরুনিকল মোড়, মিশনপাড়া, আরবপুর, বিমানবন্দর সড়ক, শংকরপুর চোপদারপাড়া, স্টেডিয়ামপাড়া ও বকচরসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ডভাবে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও পুরো নগরের জন্য কার্যকর কোনো ‘ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন নির্মিত ড্রেনের সঙ্গে পুরোনো ড্রেন, খাল কিংবা নদীর সংযোগ অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর। ড্রেন নির্মাণকেন্দ্রিক এসব প্রকল্পে পানি কোথা থেকে আসবে, কোথায় গিয়ে নিষ্কাশিত হবে এবং কত সময়ের মধ্যে নিষ্কাশন হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

পৌর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু জানান, একসময় শহরের অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি আশপাশের খাল, বিল, পুকুর ও নিচু জমিতে গিয়ে জমা হতো। এখন সেসব জায়গা ভরাট হয়ে আবাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রকৃতির নিজস্ব পানি ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহর পানির নিচে চলে যাচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান মজুর মতে, শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান ভরসা ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদী। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট এবং নাব্যতাসংকটে সেই নদীগুলোর সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। ড্রেন পরিষ্কার করা হলেও পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা আমিনুর রহমান হিরু জানান, শহরের অনেক ড্রেন নির্মাণেই কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। কোথাও পানির প্রবাহের মাত্রা (লেভেল) ঠিক নেই, কোথাও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলের অনেক কালভার্ট বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা মুখ ভরাট হয়ে আছে। বিশেষ করে খড়কি, গাজীর বাজার ও শংকরপুর টার্মিনাল এলাকায় পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হচ্ছে।

যশোর সরকারি এমএম কলেজের সাবেক অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, শহরের অন্যতম প্রাকৃতিক জলাধার ‘বিল হরিণা’ একসময় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল ও ভরাটের কারণে সেই সক্ষমতা এখন বিলীন।

ভৈরব নদ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, নদী ও খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না করে শুধু ড্রেন নির্মাণ কিংবা পরিষ্কার কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা না করে প্রকল্প নিলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও একই সমস্যা থেকে যাবে।

যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন জানান, গত দুই বছরে ২৪৭ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে খড়কি, চোরমারা দীঘিপাড়সহ কয়েকটি এলাকায় ড্রেন ও সড়ক সংস্কার এবং পালবাড়ি থেকে চাঁচড়া পর্যন্ত খাল খননের কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।