নেতা-কর্মীদের নৈতিকতা ও সতর্কতার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘গায়ে যদি আপনার সাদা কাপড় থাকে, আপনাকে যত্নশীল হতে হবে... সাদা কাপড়ে দাগ লাগে, কথা ঠিক না। সাদা কাপড়ে কম লাগে, কিন্তু যা লাগে, তা ভাসে। ভেরি কেয়ারফুল।’
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মাল্টিপারপাস হলে ঢাকা জেলা জামায়াত আয়োজিত সদস্য (রুকন) সম্মেলনে তিনি এই কথা বলেন। নৈতিকতার প্রশ্নে দল কোনো ছাড় দেয় না উল্লেখ করে আমির জানান, কারও অন্যায় ধরা পড়লে তা সহনীয় হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে, তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের দল নয়, আমরাও মানুষ। আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়। আমরা পরিষ্কার বলেছি যে অন্যায় আর জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে চলে না। কিন্তু এর দ্বারা এটাও আমরা মিন করছি না যে আমরা কোনো অন্যায় করি না।…আমাদের অন্যায়-অপরাধ দেখলে ধরে দিন। আমরা কথা দিচ্ছি, সংশোধন করব।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজ মন্ত্রণালয়ের কাজে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সব বিষয়ে এক্সপার্ট, কিন্তু ওনার নিজের মন্ত্রণালয়ের ওপর উনি এক্সপার্ট নন কেন? যাঁর যাঁর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, তাঁদের পালন করার সুযোগ দিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব আপনার পালন করার দরকার নেই। ওনাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। আপনি আপনার মন্ত্রণালয়ে অ্যাটেনশন দিন। জাতিকে শান্তিতে থাকতে দিন।’
ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এক হুইপের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আগের দিন এক হুইপকে বলতে দেখেছেন, যেকোনো দেশ থেকেই যে-ই আসুক, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজিকে জাতীয়করণ করা হলো কি না, তা আল্লাহই জানেন।’ তিনি দাবি করেন, সদিচ্ছা থাকলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব, তবে বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তারাই এটি করছেন।
গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না এবং অন্য দেশ থেকেও একই প্রত্যাশা রাখে। সীমান্ত পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তি বিঘ্নিত হলে আপনারাও শান্তিতে থাকতে পারবেন না।’
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ক্ষমতায় থাকাকালীন ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ওই বিচারের নামে তামাশা করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে প্রভাবশালী ও কালো শক্তির বিষয়টি সামনে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বেশি সংবিধান কচলাতে যাইয়েন না। সংবিধান কচলালে নিজেদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবেন না। সংবিধানে অনেক কিছু আছে, এখনো হাত দিতে পারেন নাই। হাত দিতে পারবেন কি না, তা–ও জানি না।’ বিএনপি নেতাদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সংবিধানে নেই বলে গণভোটকে অবৈধ বলা হলে একই যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার বা ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও অবৈধ হয়ে যাবে। তিনি স্পষ্ট করেন, জনগণ সংবিধান সংশোধনের নয় বরং সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং সরকার যদি কেবল ‘মতলবি সংশোধন’ করে তবে তা জামায়াত মেনে নেবে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের জটিলতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৩ থেকে ৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। জাতিসংঘ ১ হাজার ৪৫২ জনের মৃত্যুর কথা বললেও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অনেক গুম ও হত্যার হিসাব পাওয়া যায়নি। জামায়াত নিজস্ব উদ্যোগে শহীদদের প্রোফাইল তৈরি করছে, যার ১২টি ভলিউম সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৩তম ভলিউমের কাজ চলছে।
পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি জানান, থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন আহতদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন নতুন সরকারের কেউ তাঁদের দেখতে যায়নি। শহীদ পরিবারের সম্মানী ভাতা না বাড়ানো এবং বাজেটে আলাদা বরাদ্দ না রাখার বিষয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)।