রাতভর জেগে কাজ করা বা পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার পর অনেকেই ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং ব্রেইন ফগে ভোগেন। এ অবস্থায় বেশির ভাগ মানুষ এক কাপ কফির ওপরই ভরসা করেন। তবে সম্প্রতি একটি গবেষণাকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে, কফির বদলে ক্রিয়েটিন কি মস্তিষ্ককে চাঙা রাখতে সাহায্য করতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিষয়ে প্রাথমিক কিছু গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এখনই কফির বিকল্প হিসেবে ক্রিয়েটিন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া যায় না। পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প হিসেবে কোনো সাপ্লিমেন্ট কাজ করতে পারে না।
ক্রিয়েটিন কী?
ক্রিয়েটিন একটি প্রাকৃতিক যৌগ, যা শরীর নিজেই অল্প পরিমাণে তৈরি করে। এটি লাল মাংস ও মাছের মতো কিছু খাবারেও পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে এটি মূলত পেশির শক্তি ও ব্যায়ামের সক্ষমতা বাড়ানোর সাপ্লিমেন্ট হিসেবে পরিচিত।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রিয়েটিন শুধু পেশিতেই নয়, মস্তিষ্কেও শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি কোষে অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট বা এটিপি পুনরায় তৈরি করতে সাহায্য করে, যা শরীরের শক্তির প্রধান উৎস।
ঘুম কম হলে কীভাবে কাজ করতে পারে?
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের শক্তির চাহিদা পূরণে সমস্যা হতে পারে। এর ফলে মনোযোগ কমে যায়, চিন্তা ধীর হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমতে পারে।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একবারে উচ্চমাত্রার ক্রিয়েটিন গ্রহণের পর ঘুমবঞ্চিত ব্যক্তিদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি কিছু সময়ের জন্য উন্নত হতে পারে। তবে এই গবেষণা সীমিত সংখ্যক মানুষের ওপর করা হয়েছে এবং আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।
তাহলে কি কফির বদলে ক্রিয়েটিন খাওয়া যাবে?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর হলো, না। কফি এবং ক্রিয়েটিন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে।
কফিতে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে দ্রুত সতর্কতা বাড়ায়। অন্যদিকে ক্রিয়েটিন কোষের শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। তাই কফির মতো তাৎক্ষণিকভাবে ঘুমভাব দূর করার ক্ষমতা ক্রিয়েটিনের নেই।
একবারে বেশি ক্রিয়েটিন খাওয়া কি নিরাপদ?
যে গবেষণাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে গবেষকেরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একবারে উচ্চমাত্রার ক্রিয়েটিন ব্যবহার করেছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গবেষণার ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের জন্য এমন মাত্রা সুপারিশ করা ঠিক হবে না।
উচ্চমাত্রার ক্রিয়েটিন গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যাদের কিডনির সমস্যা আছে বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন।
কারা উপকৃত হতে পারেন?
গবেষকেরা বর্তমানে কয়েকটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর ক্রিয়েটিনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। যেমন-
নিয়মিত নাইট শিফটে কাজ করেন যারা
স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বা দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় যাদের
বয়স্ক ব্যক্তি
নিরামিষভোজী বা ভেগান
মানসিক বা শারীরিক চাপের মধ্যে থাকা মানুষ
তবে এসব ক্ষেত্রেও এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
ক্রিয়েটিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?
সঠিক মাত্রায় গ্রহণ করলে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্রিয়েটিন সাধারণত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, পেটে অস্বস্তি, বমিভাব, পানি জমে ওজন সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি না খেলে পানিশূন্যতার ঝুঁকির মতো সমস্যা দেথা দিতে পারি।
যাদের কিডনির রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা কী?
অনেকেই মনে করছেন, ক্রিয়েটিন খেলেই ঘুমের ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে বা মস্তিষ্ক আরও বেশি কার্যক্ষম হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভুল ধারণা।
এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণাই বলেনি যে ক্রিয়েটিন ভালো ঘুমের বিকল্প। এটি হয়তো নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কের শক্তি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে, কিন্তু নিয়মিত ঘুমের অভাব পূরণ করতে পারে না।
ক্রিয়েটিন নিয়ে নতুন গবেষণা আশা জাগালেও এটি এখনও ঘুমের বিকল্প বা কফির বিকল্প নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণই সুস্থ মস্তিষ্কের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যদি ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের কথা ভাবেন, তাহলে আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: গালাফ নিউজ