মহাবিশ্বের রহস্যময় সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ পৃথিবী ও চাঁদ। তবে রাতের আকাশে আলো ছড়ানো আমাদের এই একমাত্র উপগ্রহটি এক জায়গায় স্থির নেই; কোটি কোটি বছর ধরে এটি নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩ দশমিক ৮৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে। গত পাঁচ দশকের লুনার লেজার রেঞ্জিং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিমাপের এই ফলাফলে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৯ মিলিমিটারের সূক্ষ্ম তারতম্য থাকতে পারে, যা একে বর্তমান সময়ের অন্যতম নিখুঁত ভৌত পরিমাপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

লেজার রশ্মির যাতায়াতের সময় মেপে এই দূরত্ব নির্ণয় করা হয়, যেখানে সূক্ষ্মতার মাত্রা প্রায় এক মিলিমিটার। গত তিন দশকের সাব-মিলিমিটার পর্যায়ের তথ্যের মাধ্যমে চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে। নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, বর্তমানে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি এবং নিউ মেক্সিকোর চারটি পর্যবেক্ষণাগার নিয়মিত এই লেজার পরিমাপ চালায়। এর মধ্যে নিউ মেক্সিকোর অ্যাপাচি পয়েন্ট অবজারভেটরি লুনার লেজার-রেঞ্জিং অপারেশন বা অ্যাপোলো সবচেয়ে নিখুঁত তথ্য প্রদান করে।

১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে কিছু রেট্রোরিফ্লেক্টর অ্যারে বা আয়না স্থাপন করেছিলেন। সেই আয়নাগুলোতে লেজার রশ্মি পাঠিয়েই দূরত্ব মাপা হয়। মানুষের জীবনকালের হিসেবে এই গতি অত্যন্ত সামান্য, যা প্রায় মানুষের নখ বাড়ার হারের সমান। একজন মানুষের পুরো জীবদ্দশায় চাঁদ মাত্র তিন মিটারের মতো দূরে সরে যায় এবং মানব ইতিহাসের গত ৫ হাজার বছরে এই দূরত্ব বেড়েছে প্রায় ১৯০ মিটার। সাধারণ চোখে এটি স্থির মনে হলেও ভৌগোলিক সময়ের হিসেবে এটি একটি বড় পরিবর্তন।

১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে অ্যাপোলো–১১ মিশনের নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের ‘প্রশান্তির সাগর’ অঞ্চলে প্রথম লেজার রিফ্লেক্টর স্থাপন করেন। এই আয়নায় ১০০টি বিশেষ কোয়ার্টজ-গ্লাস প্রিজম ছিল, যা যেকোনো দিক থেকে আসা আলোকে সরাসরি সেদিকেই ফেরত পাঠাতে পারে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে অ্যাপোলো–১৪ ও অ্যাপোলো–১৫ মিশনে আরও কিছু আয়না বসানো হয়। অ্যাপোলো–১৫ থেকে বসানো ৩০০ কোয়ার্টজ প্রিজমযুক্ত আয়নাটি সবচেয়ে বড় হওয়ায় বর্তমান দূরত্বের হিসেবে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই দূরে সরে যাওয়ার মূল কারণ হলো জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, চাঁদের মহাকর্ষ বল এবং পৃথিবীর ভূত্বক ও মহাসাগরের যৌথ ক্রিয়ায় এটি ঘটে। চাঁদের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর কাছের অংশে যতটা তীব্র, দূরের অংশে ততটা নয়। এই আকর্ষণ বলের পার্থক্যের কারণে পৃথিবী সামান্য উপবৃত্তাকার রূপ নেয় এবং উভয় দিকে জোয়ার সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর ঘোরার গতি (২৪ ঘণ্টা) চাঁদের কক্ষপথ ঘোরার গতির (২৭ দশমিক ৩ দিন) চেয়ে বেশি হওয়ায় জোয়ারের ঢেউ চাঁদের অবস্থানের কিছুটা সামনে চলে যায়। এই এগিয়ে থাকা অংশটি চাঁদের ওপর সামনের দিকে সামান্য মহাকর্ষীয় টান প্রয়োগ করে, যার ফলে চাঁদের কক্ষপথ বড় হতে থাকে এবং প্রতিবছর চাঁদ কিছুটা উঁচু কক্ষপথে চলে যায়। কৌণিক ভরের সংরক্ষণ সূত্র অনুযায়ী, এই শক্তির উৎস হলো পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি, যার ফলে পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার গতি কমে যাচ্ছে এবং দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে।

গত সাড়ে চার শ বছর ধরে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং পৃথিবী যত দিন ঘুরবে, এটি চলতে থাকবে। এর প্রথম দৃশ্যমান প্রভাব হলো দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাওয়া; প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি বছর আগে চাঁদ কাছে থাকায় পৃথিবীর এক দিনের সময়সীমা ছিল ১৯ ঘণ্টা।

বর্তমানে সূর্যের ব্যাস চাঁদের চেয়ে ৪০০ গুণ বড় হলেও সূর্য চাঁদ থেকে ৪০০ গুণ দূরে অবস্থিত হওয়ায় আকাশে উভয়ের আকার প্রায় সমান দেখায় এবং পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সম্ভব হয়। তবে চাঁদ দূরে সরে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আকাশে তার দৃশ্যমান আকার ছোট হতে থাকবে, ফলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সংখ্যা কমে যাবে। বর্তমান গণনা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে শেষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এছাড়া মহাসাগরে জোয়ারের উচ্চতা কমে যাওয়ায় উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসবে।