যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে প্রতি গ্রীষ্মে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো হাজার হাজার মাছ ঝরে পড়ার এই দৃশ্য দেখে অনেকেই অবাক হন। আপাতদৃষ্টিতে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক এক সুনির্দিষ্ট পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনা, যা দীর্ঘ বছর ধরে পাহাড়ি হ্রদগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।

ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের ওয়াইল্ডলাইফ রিসোর্সেস বিভাগ প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে এই বিশেষ কার্যক্রমটি পরিচালনা করে। তাদের কর্মীরা ছোট বিমানে বিশেষভাবে নির্মিত পানির ট্যাংক বহন করেন, যা ছোট ছোট মাছে পূর্ণ থাকে। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত দুর্গম হ্রদগুলোর ওপর দিয়ে বিমান উড়ে যাওয়ার সময় পানিসহ মাছগুলো নিচে ফেলে দেওয়া হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বিমানের পেছন থেকে রঙিন কাগজ বা চুমকি ঝরে পড়ছে।

পাহাড়ি উঁচু অববাহিকার এই হ্রদগুলোতে সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকায় গাড়িতে করে পৌঁছানো অসম্ভব। ফলে মাছ পাঠানোর সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে বিমানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ইতিহাস অনুযায়ী, এখানকার কিছু হ্রদে আগে কোনো মাছ ছিল না, আবার কিছু হ্রদে প্রাকৃতিকভাবে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় না। এছাড়া পর্যটক ও মাছশিকারিদের ভিড়ে মাছের পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পায়। নিয়মিত বিরতিতে নতুন মাছ না ছাড়লে এই হ্রদগুলোতে মাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় বিমান থেকে মাছ ছাড়ার কৌশলটি চালু করা হয়েছে।

আকাশ থেকে মাছ ফেলার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে বিপজ্জনক মনে হলেও, গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতিটি সফলভাবে ব্যবহার করছেন। বিমানের মাধ্যমে যে মাছগুলো ছাড়া হয়, সেগুলোর আকার সাধারণত এক থেকে তিন ইঞ্চির মধ্যে থাকে। হাজার কেজি পানির সঙ্গে এই ছোট মাছগুলোকে বিমানে করে নেওয়া হয়।

মাছ ছাড়ার সময় পাইলটরা বিমানের গতি কমিয়ে নির্দিষ্ট হ্রদের ওপর পানি ও মাছ একসঙ্গে ফেলে দেন। মাছগুলো অত্যন্ত ছোট ও হালকা হওয়ায় বাতাসের বাধার কারণে সরাসরি আছড়ে না পড়ে পাতার মতো ভেসে পানিতে গিয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে ফেলা মাছের ৯৫ শতাংশের বেশি জীবিত থাকে এবং পানিতে পড়ার পর তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো মাছ এই প্রক্রিয়ায় ছাড়া যায় না; প্রজাতির নির্বাচন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত রেইনবো ট্রাউট, কাটথ্রোট ট্রাউট, ব্রুক ট্রাউট, টাইগার ট্রাউট, স্প্লেক এবং আর্কটিক গ্রেলিং প্রজাতির মাছ ব্যবহার করা হয়, যা মাছশিকারিদের কাছে জনপ্রিয়। এর মধ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরি অধিকাংশ প্রজাতি প্রজননে অক্ষম বা বন্ধ্যা হয়, যাতে মাছের মোট সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হ্রদের ভাটিতে থাকা দেশীয় মাছের কোনো ক্ষতি না হয়। তবে কিছু হ্রদে কাটথ্রোট ট্রাউটের মতো দেশীয় মাছও ছাড়া হয়, যাতে স্থানীয় প্রজাতির বিকাশ অব্যাহত থাকে।