বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনোদন তারকা জেনিফার লোপেজের জন্মদিন আজ। ১৯৬৯ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী এবার ৫৭ বছরে পা রাখছেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি একাধারে গায়িকা, অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী, প্রযোজক, উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন আইকন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
তবে লোপেজের পেশাগত সাফল্যের মতোই ব্যক্তিজীবনও বারবার আলোচনায় এসেছে। চারবার বিয়ে, একাধিক আলোচিত প্রেম, বিচ্ছেদ, নতুন করে ভালোবাসায় ফেরা—জেনিফার লোপেজের জীবন যেন হলিউডের এক চলমান নাটক। কিন্তু এসব উত্থান-পতনের মধ্যেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে সফল নারী তারকাদের একজন হিসেবে।
.২০২১ সালেই আবার বেন অ্যাফ্লেকের সঙ্গে সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে। প্রায় ২০ বছর পর তাঁদের পুনর্মিলন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে লাস ভেগাসে ঘরোয়া আয়োজনে বিয়ে করেন তাঁরা। পরে জর্জিয়ার একটি বিশাল অনুষ্ঠানে আবারও বিবাহোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, দুই দশক পর এবার হয়তো তাঁদের ভালোবাসার গল্প স্থায়ী হবে।.
ব্রঙ্কস থেকে বিশ্বজয়
পুয়ের্তো রিকান অভিবাসী পরিবারের মেয়ে জেনিফার ছোটবেলা থেকেই নাচ ও গানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে নাচ শেখা শুরু করেন। পরে অভিনয় ও সংগীত—দুই অঙ্গনেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৯৭ সালে ‘সেলেনা’ চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি গায়িকা সেলেনার চরিত্রে অভিনয় লোপেজকে রাতারাতি হলিউডে পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘আউট অব সাইট’, ‘দ্য ওয়েডিং প্ল্যানার’, ‘মেইন ইন ম্যানহাটান’, ‘মনস্টার-ইন-ল’, ‘হাসলার’, ‘ম্যারি মি’—একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন।
সংগীতেও লোপেজের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ‘ইফ ইউ হ্যাড মাই লাভ’, ‘লাভ ডোন্ট কস্ট আ থিং’, ‘জেনি ফ্রম দ্য ব্লক’, ‘অন দ্য ফ্লোর’, ‘লেটস গেট লাউড’—এমন অনেক গানই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে।
.প্রথম বিয়ে: ওহানি নোয়া
জেনিফারের প্রথম বিয়ে হয় ১৯৯৭ সালে কিউবান বংশোদ্ভূত রেস্তোরাঁকর্মী ওহানি নোয়ার সঙ্গে।
তখন লোপেজ ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। ১৯৯৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। পরে ওহানি নোয়া জেনিফারকে নিয়ে একটি বই প্রকাশের চেষ্টা করলে আইনি লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘদিন আদালতে এ বিরোধ চলে।
দ্বিতীয় বিয়ে: ক্রিস জাড
২০০১ সালে ব্যাকআপ নৃত্যশিল্পী ক্রিস জাডকে বিয়ে করেন জেনিফার। একটি মিউজিক ভিডিওর সেটে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু এ সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় ৯ মাসের মধ্যেই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
লোপেজের মতে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় যিনি ছেড়ে চলে যান, তিনি সব সময় বিজয়ী নন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, অধিকাংশ বিচ্ছেদে যাকে ছেড়ে যাওয়া হয়, আসল বিজয়ী সে-ই।’ এরপর আরও স্পষ্ট করে যোগ করেন, ‘আপনি যদি সারা জীবন মানুষের হৃদয় ভেঙে বেড়ান, তাহলে পরাজিত আসলে আপনিই।’.
বেনিফার: হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেম
২০০২ সালে অভিনেতা বেন অ্যাফ্লেকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান জেনিফার। দুজনের নাম মিলিয়ে তখন সংবাদমাধ্যম তাঁদের ডাকতে শুরু করে ‘বেনিফার’ নামে। বাগ্দানও হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিশ্বজুড়ে ভক্তদের কাছে এটি ছিল বড় ধাক্কা। বছরের পর বছর আলাদা থেকেও তাঁদের গল্প শেষ হয়নি।
তৃতীয় বিয়ে: মার্ক অ্যান্থনি
২০০৪ সালে লাতিন সংগীতশিল্পী মার্ক অ্যান্থনিকে বিয়ে করেন জেনিফার। এটি ছিল তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘ ও স্থিতিশীল সম্পর্ক। ২০০৮ সালে তাঁদের যমজ সন্তান ম্যাক্স ও এমির জন্ম হয়। দুজনকে হলিউডের অন্যতম শক্তিশালী তারকা দম্পতি হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাত বছর সংসারের পর ২০১১ সালে আলাদা হওয়ার ঘোষণা দেন। ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
তবে বিচ্ছেদের পরও সন্তানের স্বার্থে দুজন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
অ্যালেক্স রদ্রিগেজ: বিয়ের আগেই বিচ্ছেদ
২০১৭ সালে সাবেক বেসবল তারকা অ্যালেক্স রদ্রিগেজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান জেনিফার। ২০১৯ সালে তাঁদের বাগ্দান হয়। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিয়ে পিছিয়ে যায়। পরে নানা গুঞ্জনের মধ্যেই ২০২১ সালে সম্পর্কের ইতি টানেন তাঁরা।
পুরোনো প্রেমে নতুন অধ্যায়
২০২১ সালেই আবার বেন অ্যাফ্লেকের সঙ্গে সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে। প্রায় ২০ বছর পর তাঁদের পুনর্মিলন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে লাস ভেগাসে ঘরোয়া আয়োজনে বিয়ে করেন তাঁরা। পরে জর্জিয়ার একটি বিশাল অনুষ্ঠানে আবারও বিবাহোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, দুই দশক পর এবার হয়তো তাঁদের ভালোবাসার গল্প স্থায়ী হবে।
চতুর্থ বিয়েরও সমাপ্তি
কিন্তু সুখের সেই অধ্যায়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দাম্পত্যে দূরত্ব বাড়ার খবর কয়েক মাস ধরেই শোনা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে জেনিফার লোপেজ বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। পরে তাঁদের বিচ্ছেদ আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।
এ নিয়ে চারবার বিয়ে এবং চারবারই বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হলো লোপেজের।
সম্পর্ক নিয়ে জেনিফারের দর্শন
বিচ্ছেদের পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জেনিফার বলেছেন, তিনি এখন আর নিজের সুখের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে চান না। তাঁর ভাষায়, ভালোবাসা সুন্দর, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বড় কিছু নয়। তিনি বলেছেন, একা থাকতেও শেখা প্রয়োজন। কারণ, সুখের শুরু নিজের ভেতর থেকেই।
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর লোপেজ মানসিকভাবে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। ধ্যান, শরীরচর্চা, কাজ এবং সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবই তাঁর জীবনের বড় শক্তি।
‘বিচ্ছেদ হলে শোক নয়; বরং উদ্যাপন করা উচিত।’ কথাটা শুনে অবাক লাগতেই পারে। কিন্তু এমনটাই বিশ্বাস করেন হলিউডের গায়িকা ও অভিনেত্রী জেনিফার লোপেজ। ব্যক্তিগত জীবনে একাধিক সম্পর্কের উত্থান-পতন দেখার পর তাঁর উপলব্ধি, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়; বরং সেটিই হতে পারে জীবনের নতুন এবং আরও ভালো অধ্যায়ের শুরু।
.সম্প্রতি ইন্টারনেট টক শো ‘সাবওয়ে টেকস’-এ হাজির হয়ে সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা ও নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন লোপেজ। তাঁর মতে, সম্পর্ক শেষ হওয়াকে নেতিবাচকভাবে না দেখে উদ্যাপন করা উচিত।
‘আমার মনে হয়, বিচ্ছেদ হলে আমাদের একটা পার্টি দেওয়া উচিত। কেউ যদি বলে, “তোমাদের বিচ্ছেদ হয়েছে?” তখন উত্তর হওয়া উচিত, “অভিনন্দন!” কারণ, প্রথমত, তোমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছ। দ্বিতীয়ত, সম্ভবত সেটিই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।’
লোপেজের মতে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় যিনি ছেড়ে চলে যান, তিনি সব সময় বিজয়ী নন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, অধিকাংশ বিচ্ছেদে যাকে ছেড়ে যাওয়া হয়, আসল বিজয়ী সে-ই।’ এরপর আরও স্পষ্ট করে যোগ করেন, ‘আপনি যদি সারা জীবন মানুষের হৃদয় ভেঙে বেড়ান, তাহলে পরাজিত আসলে আপনিই।’
কেবল তারকা নন, সফল ব্যবসায়ীও
জেনিফার লোপেজ শুধু সিনেমা বা গানের ওপর নির্ভর করে সম্পদ গড়েননি। তিনি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, ফ্যাশন ও সৌন্দর্যপণ্য ব্যবসা রয়েছে, সুগন্ধি ব্র্যান্ড বাজারে এনেছেন, প্রসাধনী ব্র্যান্ড জেলো বিউটি চালু করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকেও বিপুল আয় করেন।
বিশ্বসফর, সিনেমা, স্ট্রিমিং প্রকল্প, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও ব্যবসা—সব মিলিয়ে লোপেজ একটি বহুমুখী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছেন।
কত সম্পদের মালিক
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জেনিফার লোপেজের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪০–৪৫ কোটি মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। হলিউডের সবচেয়ে ধনী নারী শিল্পীদের তালিকায় তিনি নিয়মিত স্থান পান।
বয়স কেবল একটি সংখ্যা
৫০ পেরিয়েও জেনিফার লোপেজ মঞ্চে যে শক্তি, নাচ ও উপস্থিতি দেখান, তা এখনো তরুণ শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা। ২০২০ সালের সুপার বোল হাফটাইম শো থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিশ্বসফর—সব জায়গায় তিনি প্রমাণ করেছেন, কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা একজন শিল্পীকে কতটা দীর্ঘ সময় শীর্ষে রাখতে পারে।
বাজফিড ও পিপল ডটকম অবলম্বনে