২০২৬ সাল গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য–কাহিনি রচয়িতা রোমেনা আফাজের জন্মশতবর্ষ। তিনি জনপ্রিয় ধারার লেখক ছিলেন, ছিলেন একজন নারী এবং জীবন অতিবাহিত করেছেন মহানগর থেকে দূরবর্তী ‘মফস্সল’ শহর বগুড়ায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যাসন্তান তিনি, পিতা ছিলেন পুলিশের দারোগা, পদস্থ কেউ নন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল বাল্যে, তখন বয়স মাত্র ১৩। পড়াশোনার চেষ্টা যথাসাধ্য করেছিলেন, বিয়ের পর ১৯৪৩ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দুই কন্যা ও সাত পুত্রের জননী ছিলেন তিনি। জলেশ্বরীতলার যে বাড়িতে সংসার পেতেছিলেন, সেখানেই থেকে গেছেন আজীবন—স্বামী-পুত্র–কন্যা নিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূর যথাকর্তব্য পালন করে।
লেখক হিসেবেও রোমেনা আফাজ প্রান্তবাসিনী। তীক্ষ্ণধী গোয়েন্দা কিংবা দরিদ্রবান্ধব দস্যুদের নিয়ে যাঁরা লেখেন, লোকরঞ্জনের বাসনা তাঁদের মধ্যে থাকে প্রবল; হয়তো এ কারণেও এই ধারার রচনা সাহিত্যের মূলস্রোতে বিশেষ আসন পায় না। রোমেনা আফাজ তাঁর দস্যু বনহুর ও দস্যুরানী সিরিজ নিয়ে এমন ধারার একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ১৯৬০–এর দশকে এবং ১৯৮৫ সালে দস্যু বনহুর সিরিজের ১৩৮তম খণ্ড উপহার দিয়ে তাঁর লেখকজীবনের ইতি। তাঁর গ্রন্থের প্রকাশক ঢাকা-চট্টগ্রামের মূলধারার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। পরিবার পরিচালিত বগুড়ার সাহিত্য কুটির প্রকাশনা সংস্থা এসব গ্রন্থ প্রকাশ ও বিপণনের দায়িত্ব পালন করে। বস্তুত সমগ্র বিচারেই রোমেনা আফাজ প্রান্তবর্তী।
এমন এক নারী কীভাবে লেখালেখির জগতে পা বাড়ালেন এবং নিজস্ব ব্যতিক্রমী সাহিত্য ভুবন তৈরি করলেন তার তাৎপর্য ও অবদান তলিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে, তবে সে জন্য প্রয়োজন ভিন্নতর সাহিত্য–বিচার ও মূল্যায়ন–নির্দেশিকা। প্রচলিত পন্থায় রোমেনা আফাজের তাৎপর্য বুঝতে গেলে অবজ্ঞা ও অবহেলাই তাঁর প্রাপ্য হবে, সেটা তাঁর জীবিতকালে ঘটেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমরা নিজেরাই।
রোমেনা আফাজ বহুভাবে বিস্ময় সঞ্চার করেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, রক্তে আঁকা ম্যাপ—এক দস্যুরানীর কাহিনি। দরিদ্রবান্ধব এমন ডাকাতের কথা তো নানা লেখক নানাভাবে বলেছেন। তবে দুটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়। তিনি লেখক হিসেবে নিয়েছিলেন ঝকঝকে আধুনিক পদবিবিহীন পরিচিতি। নিজের নাম রোমেনার সঙ্গে স্বামী আফাজউল্লাহ সরকারের নামের প্রথমাংশ যোগ করে হলেন রোমেনা আফাজ। অনেকটা যেন পূর্বসূরি সাহিত্যিক সুফিয়া কামালের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, যিনি স্বামী কামালউদ্দিন খানের আদ্যক্ষর যুক্ত করে নতুন সাহিত্যিক নাম ধারণ করেছিলেন।
দস্যুরানী সিরিজ হিসেবেই পরিকল্পিত ছিল, তবে খুব বেশি পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। ১২ খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছে এই সিরিজ। নারী লেখকের সৃষ্ট নারীদস্যুর কাহিনি পড়তে পাঠকসমাজ হয়তো প্রস্তুত ছিল না। তেমন উপলব্ধি থেকে বুঝি বা এর পাশাপাশি রোমেনা আফাজ প্রবর্তন করলেন দস্যু বনহুর সিরিজ, ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় যে সিরিজের প্রথম খণ্ড। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক প্রকাশ পায় দস্যু বনহুরের দুর্ধর্ষ কাহিনি। মোট ১৩৮ খণ্ড প্রকাশের পর তিনি সিরিজের ইতি টানেন দস্যু বনহুরের শেষ যাত্রা গ্রন্থে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে, ১৯৮৫ সালে।
.রোমেনা আফাজের বনহুরের আবির্ভাব সামন্তবাদী পটভূমিকায়, যেখানে অত্যাচারী ভূস্বামী বা ধনিকের বিরুদ্ধে নির্ধনের হয়ে চলে বনহুরের দস্যুতা। কিন্তু জীবন পাল্টায়, সমাজ বদলে যায়, রোমেনা আফাজের নায়কের বিচরণক্ষেত্রও রূপান্তরিত হয়। সেই পরিবর্তনময়তা ধারণ করার মধ্যে রয়েছে রোমেনা আফাজের মুনশিয়ানা। ফর্মুলা ধরেই এগোয় বনহুরের কাহিনি, সর্ববিদ্যায় বনহুরের পারদর্শিতা, সাজ বদলে অসাধারণ দক্ষতা, এর সঙ্গে অস্ত্রচালনা তো রয়েছেই।.
বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতে এমন সাফল্য আর কেউ অর্জন করেছেন কি না জানা নেই। তুলনীয় হতে পারে কাজী আনোয়ার হোসেন এবং তাঁর গোয়েন্দা সিরিজ মাসুদ রানা। তবে উভয়ের মধ্যে ফারাক বিস্তর—যদিও উভয়ে একই ধারার কাহিনি রচয়িতা, পাঠকপ্রিয়তাও তাঁদের বিপুল। সেই সঙ্গে এটাও অনুধাবনযোগ্য যে দুইয়ের পাঠক দুই ঘরানার বাসিন্দা। তদুপরি উভয়ে তাঁদের বই প্রকাশের জন্য গঠন করেছিলেন নিজস্ব সংস্থা—সেবা প্রকাশনী ও সাহিত্য কুটির। এ ক্ষেত্রেও দুই সংস্থার মধ্যে পার্থক্য ছিল বিপুল।
সাহিত্যবিচারের প্রচলিত মাপকাঠি নিয়ে রোমেনা আফাজ মূল্যায়নে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। তাঁর রচনার বড় দুর্বলতা এর ভাষাশৈলী, ব্যাকরণগত ত্রুটি, বানানবিভ্রাট, পরিচ্ছেদ বিভাজন ইত্যাদি। লেখা সাজিয়ে–গুছিয়ে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবহেলা ছিল, বলা যেতে পারে একধরনের অনীহাই যেন। তিনি তাঁর নায়ক বনহুরের কীর্তিকথা নানাভাবে বয়ান করেছেন, কাহিনি ও ঘটনার ঘনঘটা ছিল তাঁর প্রধান উপজীব্য। এর পরিবেশনার দুর্বলতা তিনি উপেক্ষাই করেছেন। সাহিত্যিক মানদণ্ডে তিনি হয়তো উত্তীর্ণ হবেন না, তেমন পরীক্ষা দিতে তিনি বোধ করি উৎসাহীও ছিলেন না। তাঁর মূল আগ্রহ ছিল পাঠকদের প্রতি, যাদের বড় অংশ ছিল কিশোর, যারা গল্পপাঠে আনন্দ পেতে চায়, কাহিনির উন্মাদনায় ভেসে যেতে পারলে সন্তুষ্ট হয়। এই ধরনের সাহিত্যকে সাধারণত ‘পাল্প ফিকশন’ বলা হয়, আমরা ‘বাজারি সাহিত্য’ বলতে পারি। তবে একে যদি সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে আমরা স্বীকৃতি দিই, সে ক্ষেত্রে রোমেনা আফাজ দাবি করবেন স্বতন্ত্র মূল্যায়ন, বিশেষ বিবেচনা।
রোমেনা আফাজের মূল্যায়নে যে ভিন্নতর মাপকাঠি প্রয়োজন, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু কথার অবতারণা এখানে করা যায়। সাহিত্যবিচারে একটি প্রচলিত রীতি হচ্ছে ফর্ম ও কনটেন্ট তথা শৈলী ও বিষয়বস্তু কিংবা আধার ও আধেয় বিবেচনা। ফর্মের বিচারে রোমেনা আফাজকে নাকচ করে দেওয়ার অনেক কারণ রয়েছে, কিন্তু কনটেন্ট নিয়ে কিছু কথা বলার থাকে। তাঁর সৃষ্ট দস্যু বনহুরকে বিবেচনায় নিতে হলে ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত কুড়ি বছরের অভিযাত্রায় যে ১৩৮টি কাহিনি তিনি ফেঁদেছেন, সেখানে দেখা যাবে বৈচিত্র্য ও বিবর্তন, নিছক দুস্থবান্ধব দস্যুতা থেকে তীক্ষ্ণধী গোয়েন্দায় তাঁর নায়কের রূপান্তর এবং সর্বক্ষেত্রে মুশকিল আসান হয়ে বনহুরের আবির্ভাব দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের চিরায়ত ব্রত নিয়ে। তবে এই সর্বত্রের কোনো একরূপত্ব নেই, আর সেখানেই দেখি রোমেনা আফাজের চমক।
রোমেনা আফাজের বনহুরের আবির্ভাব সামন্তবাদী পটভূমিকায়, যেখানে অত্যাচারী ভূস্বামী বা ধনিকের বিরুদ্ধে নির্ধনের হয়ে চলে বনহুরের দস্যুতা। কিন্তু জীবন পাল্টায়, সমাজ বদলে যায়, রোমেনা আফাজের নায়কের বিচরণক্ষেত্রও রূপান্তরিত হয়। সেই পরিবর্তনময়তা ধারণ করার মধ্যে রয়েছে রোমেনা আফাজের মুনশিয়ানা। ফর্মুলা ধরেই এগোয় বনহুরের কাহিনি, সর্ববিদ্যায় বনহুরের পারদর্শিতা, সাজ বদলে অসাধারণ দক্ষতা, এর সঙ্গে অস্ত্রচালনা তো রয়েছেই। পরবর্তী পর্যায়ের কাহিনিতে সুন্দরী নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে পাঠকের মন জয় করার আকাঙ্ক্ষা সর্বদা বহন করেন কাহিনিকার। এ ক্ষেত্রে ফর্ম নিয়ে আক্ষেপ করা গেলেও কনটেন্ট নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। উভয়কে আলাদা করে পাল্লায় না তুলে এর সম্মিলনে কোন প্রাপ্তিযোগ আমাদের ঘটে, সেটা দেখা দরকার। এখানেই আসে উত্তরাধুনিক বিচারকাঠামো, ইন্টারটেক্সচুয়ালিটির প্রয়োগ, যা আমাদের টেনে নিয়ে যাবে ডিকনস্ট্রাকশনের দিকে। লেখকের অভিপ্রায় তখন মনোরঞ্জনের লক্ষ্য ছাপিয়ে স্পর্শ করে নতুন মাত্রা, যা রোমেনা আফাজ মূল্যায়নে মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।
.পাকিস্তানি বন্দিশিবিরে আটক বাঙালিদের শ্রমদাস হিসেবে জাহাজে চালান করা হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যে, সেই যাত্রায় ছদ্মবেশী বনহুর দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করে জাহাজের গতিপথ পাল্টে নিয়ে যায় জুনাগড় বন্দরে। মুক্ত বন্দীদের স্বদেশে ফেরার ব্যবস্থা করার কাহিনি বর্ণনা করেছেন বগুড়াবাসিনী নারী, জীবনে কখনো যিনি পাকিস্তানে পা রাখেননি, বগুড়া ছেড়ে ঢাকাতেও বিশেষ আসেননি।.
বর্তমান লেখকের রোমেনা আফাজ পাঠ-অভিজ্ঞতা সামান্যই, তারপরেও তাঁর কাহিনির পটভূমিকার কিছু তাৎপর্যময় দিক উল্লেখ না করে পারা যায় না। যে দস্যুরানী সিরিজ খুব বেশি পাঠকপ্রিয়তা পায়নি, তারই এক খণ্ড, খুনির সাধনাতে গোয়েন্দা মিস্টার আহাদের বাল্যবন্ধু শঙ্কর, শঙ্করের গৃহে মা করুণাময়ী ও বোন যূথিকাকে নিয়ে যে দৃশ্যের অবতারণা, হতে পারে সেটা এক পার্শ্বঘটনা; কিন্তু তার রয়েছে অন্য তাৎপর্য। যূথিকার বাড়িতে আপ্যায়ন, সেই সঙ্গে তার গান মনে করিয়ে দেবে মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহ এবং সেখানে মুসলিম যুবকের অনায়াস স্থান। এরপর নৌকায় যমুনা পাড়ি দিয়ে তারা যখন পৌঁছাল কাকাবাবু অখিল রায়ের গৃহে, সেই নদী পারাপারের বর্ণনা নৌকাবিলাস স্মরণ করিয়ে দেয়। সৌম্য শান্ত কাকাবাবু অখিল রায় তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বসতবাটিতে নিয়ে চলেন, আর কথার ফাঁকে শঙ্কর আহাদের কানে মুখ নিয়ে বলে, ‘আহাদ, এবার তোমার এক দিনের জন্য হিন্দু সাজতে হচ্ছে, বুঝেছ? কাকিমা বড় গোঁড়া কি না।’ এমন দৃশ্য এঁকেছেন যিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বিভাজন পেরিয়ে, তাঁর দৃষ্টির স্বচ্ছতা ও সৌহার্দ্যপ্রীতি আমরা বুঝতে পারি। আমরা বাস্তবতার উপলব্ধি পাই প্রবীণ গৃহিণীর সংস্কার ও তরুণের তা মেনে নেওয়ার ঔদার্যে, কোনো রকম তিক্ততা ছাড়া দ্বন্দ্ব-ফারাকের সহাবস্থানে, যেটা ছিল বাংলার সমন্বিত সমাজের মাহাত্ম্য।
এমনি উদার সেক্যুলার মানস রোমেনা আফাজ বরাবর বহন করেছিলেন। এর প্রতিফলন বনহুর-কাহিনিতেও নানাভাবে ফুটে ওঠে। আরও পরের রচনা দিল্লির বুকে বনহুর-এ আমরা দেখি সম্প্রীতির সমাজের নানা প্রতিফলন। ধর্মান্ধতা উপমহাদেশে উভয় দিক থেকে সামাজিক শরীরে বারবার ছুরিকাঘাত করেছে, সেই বাস্তবতায় রোমেনা আফাজের ভুবন ভিন্ন বার্তা বহন করে। অন্যদিকে পাকিস্তানে দস্যু বনহুর অনেক বিচারে বিস্ময়কর। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানে কর্মরত তিন লক্ষাধিক বাঙালিকে যেভাবে বিভিন্ন শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। এ ঘটনা নিয়ে আমাদের নিজেদেরও পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ও বিচারের অভাব রয়েছে। পাকিস্তানি বন্দিশিবিরে আটক বাঙালিদের শ্রমদাস হিসেবে জাহাজে চালান করা হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যে, সেই যাত্রায় ছদ্মবেশী বনহুর দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করে জাহাজের গতিপথ পাল্টে নিয়ে যায় জুনাগড় বন্দরে। মুক্ত বন্দীদের স্বদেশে ফেরার ব্যবস্থা করার কাহিনি বর্ণনা করেছেন বগুড়াবাসিনী নারী, জীবনে কখনো যিনি পাকিস্তানে পা রাখেননি, বগুড়া ছেড়ে ঢাকাতেও বিশেষ আসেননি।
গল্পে এরপর বনহুরের কাজ হলো সাগাইসহ বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আটক বাঙালি নারীদের মুক্ত করা। বাস্তবতা বর্ণনার সামান্য উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সংবরণ দায়; নারী পাচারকারী আলী জাফরী বলে ওঠে, ‘বাংলাদেশে বাঙালিদের চিৎকার করে গলা ফাটাতে দাও। পাকিস্তান থেকে একটিও বাঙালিকে আমরা বাংলাদেশে যেতে দেব না। বাঙালিরা আমাদের শুধু সর্বনাশই করেনি, ওরা আমাদের সবকিছু বরবাদ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় তাজা ব্যবসার জায়গা। বাংলাদেশে ব্যবসা করেই আমাদের পাকিস্তানের জৌলুস বেড়েছে। আমরা এখানের মানুষ এমনভাবে ফেঁপে উঠেছি আর আমাদের মাথায় ওরা কুঠার মারল। একটা বাঙালি জান নিয়ে ফেরত যেতে পারবে না। হ্যাঁ, বিদেশিদের কিন্তু একটুও জানতে দেওয়া হবে না—তাতে আমাদের পাক সরকারের বহুত বদনাম হবে।’
.কে করবেন এমন কাজ রোমেনা আফাজকে নিয়ে, বদলে দেবেন সাহিত্যপাঠের প্রচলিত ধরন, আমরা প্রান্তবাসিনী ব্যতিক্রমী নারী এই লেখককে নতুনভাবে জানতে চিনতে শিখব, আর তার মাধ্যমে নিজেদের বুঝব আরও নিবিড়ভাবে—সেই প্রতীক্ষায় রইলাম। তার আগে জন্মশতবর্ষে অভিবাদন জানাই রোমেনা আফাজকে। তাঁকে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য মস্ত ক্ষতি।.
নিশ্চিতই রোমেনা আফাজ সাহিত্যব্রতীদের কাছে ভিন্নতর দাবি নিয়ে হাজির হয়েছেন। সেই প্রাপ্য তাঁকে আমরা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। তাঁর দুর্বলতা যেন বৃহত্তর পরিসরে তাঁর ভূমিকা ও অবদানকে আচ্ছন্ন না করে, সেদিকে নজর দেওয়া কর্তব্য। একজন নারী প্রান্তবর্তী থেকে কীভাবে নিজের জন্য স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ধারণ করলেন, তা প্রকাশের জন্য রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনির ফর্ম বেছে নিলেন এবং ঘরোয়া জীবনের পরিধিতে বাস করেও কল্পনার পাখায় অন্য আকাশে গা ভাসালেন, সেই কল্পচারিতায় মর্ত্যের বাস্তবতা কোন প্রকাশ খুঁজে নিয়েছে, তা বিশেষভাবে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।
সার্বিক বিবেচনায় রোমেনা আফাজ আমাদের সাহিত্যের ভিন্ন স্বর, প্রান্তবর্তী কণ্ঠ—সাবঅলটার্ন ভয়েস। এই কণ্ঠস্বর শোনা ও অনুধাবনের জন্য তাঁর টেক্সট গুরুত্বপূর্ণ, তবে টেক্সটের ভেতর-বাহির দেখা দরকার আরও নিবিড়ভাবে। আমার মনে পড়ে জাক দেরিদার ভাবশিষ্য গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সঙ্গে আলাপচারিতার কথা। নিউইয়র্কে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি এক আন্তর্জাতিক সভার আয়োজন করেছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর আমন্ত্রণে সেই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার। আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে তিনি সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিলেন কৃষ্ণকায়–অধ্যুষিত হারলেমে তাঁর পরিচিত রেস্তোরাঁয়। নিউইয়র্কে তো রেস্তোরাঁর অভাব নেই, কিন্তু হারলেমে কেউ সচরাচর পা বাড়ায় না, কালোদের প্রতি শতাব্দীপ্রাচীন বিরূপতা থেকে অনেক অভিযোগ ভেসে বেড়ায়—হারলেমে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গুর, ছিনতাইয়ের আশঙ্কা প্রবল ইত্যাদি। তবে সেসব মুছে যায় রেস্তোরাঁর প্রাণবন্ত আবহে, বাদনরত কালোদের সাংগীতিক বলিষ্ঠতায়, গণ্ডির বাইরে আমাদের নিয়ে যাওয়ার যে কাজ করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক।
এমন সুযোগে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম সাহিত্যে ডিকনস্ট্রাকশন বিষয়ে, দেরিদার যে তত্ত্বকে তিনিই সাহিত্যবিচারের মাপকাঠি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর কথাগুলো এখনো আমাকে তাড়িত করে। বিনয় ও ঔদ্ধত্য মিলিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কেমব্রিজের সাহিত্যতত্ত্বের অভিধানে আমাকে বলেছে ডিকনস্ট্রাকশনের মাতা। ওসব কিছু নয়, আমি দেরিদার তত্ত্ব মেলে ধরেছি, তাঁর বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি এবং প্রয়োগে সচেষ্ট হয়েছি।’ তারপর সামান্য কথায় ব্যাখ্যা করলেন ডিকনস্ট্রাকশন। বললেন, ‘মফিদুল, আদ্যোপান্ত অধ্যয়ন করো, সারসত্য বুঝে নাও, বিষয়ের একবারে গভীরে প্রবেশ করো, তারপর সবকিছু উল্টোপাল্টা করে দাও, টার্ন ইট আপসাইড ডাউন, দ্যাট ইজ ডিকনস্ট্রাকশন।’
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের উপদেশ মান্য করতে আমি পারগ নই, কিন্তু এটা বুঝি রোমেনা আফাজকে অধ্যয়ন করতে হবে ভিন্নভাবে। তাঁর টেক্সট গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই টেক্সটের পাঠ আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, সেটা আরও গুরুত্ব বহন করে। সবশেষে আসে সাবঅলটার্নের স্বরসাধনা এবং নিবিড় সেই সব উপলব্ধির জোরে প্রচলিত বয়ানকে আউলা-ঝাউলা করে দেওয়া।
কে করবেন এমন কাজ রোমেনা আফাজকে নিয়ে, বদলে দেবেন সাহিত্যপাঠের প্রচলিত ধরন, আমরা প্রান্তবাসিনী ব্যতিক্রমী নারী এই লেখককে নতুনভাবে জানতে চিনতে শিখব, আর তার মাধ্যমে নিজেদের বুঝব আরও নিবিড়ভাবে—সেই প্রতীক্ষায় রইলাম।
তার আগে জন্মশতবর্ষে অভিবাদন জানাই রোমেনা আফাজকে। তাঁকে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য মস্ত ক্ষতি।