খুলনার লবণচরা এলাকায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে বাবা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। তবে মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় করা পৃথক মামলায় ওই পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড সংশোধন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এই রায় প্রদান করেন। পৃথক দুই মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম ওরফে পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ ও শরিফুল ইসলাম। তাঁরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
২০১৯ সালের ১৬ জুলাই খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক হত্যা ও ধর্ষণের পৃথক দুই মামলায় পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন। এরপর ২০১৯ সালেই ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয় এবং আসামিরা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও আপিল দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর আজ চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়।
আদালতে আসামি লিটনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও আইনজীবী মো. মিজানুর রহমান খান (মিলন), অন্য আসামিদের পক্ষে আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমান, সাইফুল ইসলাম ও হামিদুর রহমান শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক এবং বাদীপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, আইনজীবী সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা ও মো. নাজিমুদ্দীন শুনানি পরিচালনা করেন।
রায়ের পর আইনজীবী মো. মিজানুর রহমান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বাবা–মেয়েকে হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত যে ধারায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, তা সংশোধন করে ডাকাতির সঙ্গে হত্যার জন্য সংশ্লিষ্ট ধারায় মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। মেয়েকে ধর্ষণের মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। হাইকোর্ট সাজা সংশোধন করে ৯(৩) ধারার পরিবর্তে ৯(১) ধারায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। হাইকোর্টের রায়ের প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার পর আপিল করা হবে।"
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লবণচরা থানার বুড়ো মৌলভীর দরগাপাড়ার একটি সেমিপাকা ঘরে। সেখানে ৭৩ বছর বয়সী ইলিয়াস চৌধুরী ও তাঁর ৩০ বছর বয়সী মেয়ে পারভীন সুলতানা বসবাস করতেন। ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে তাঁদের ফোন বন্ধ থাকায় এবং বাড়ির ফটকে তালাবদ্ধ থাকায় সন্দেহ হয় তাঁদের ভাই ও মামলার বাদী রেজাউল আলম চৌধুরীর। প্রতিবেশীদের সহায়তায় ভেতরে প্রবেশ করে তিনি ঘর তছনছ অবস্থায় পান এবং সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা সরিয়ে বাবা ও মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাবার গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁস দেওয়া ছিল এবং বোনের পরনে সালোয়ার ছিল না, তাঁর গলায়ও ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগানো ছিল।
২০১৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন রেজাউল আলম চৌধুরী। পরবর্তীতে আসামি মো. লিটন গ্রেপ্তার হলে তিনি অপরাধ স্বীকার করেন এবং তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে জানা যায় যে অপর চার আসামি পারভীনকে ধর্ষণ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণের অভিযোগে পৃথক মামলা করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. নাজিমুদ্দীন বলেন, "ওই বাড়িতে ঢুকে প্রথমে বাবাকে রশি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে আসামিরা। পরে মেয়েকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর সেপটিক ট্যাংকে লাশ দুটি ফেলে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ঘর থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র ও নগদ টাকা নিয়ে আসামিরা পালিয়ে যায়। ঘটনার পর ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আসামি লিটনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লিটনের স্বীকারোক্তিতে পাঁচ আসামির ধর্ষণ এবং হত্যায় সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে।"