পারকিনসনস রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ শনাক্ত করা বেশ কঠিন। সাধারণত মধ্যবয়সী কোনো ব্যক্তির হাত বা মাথায় কাঁপুনি দেখা দিলে পারকিনসনস রোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়। তবে হাতের কাঁপুনি কেবল এই রোগের লক্ষণ নয়; দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন, বৃদ্ধ বয়সে সেনাইল ট্রেমার কিংবা কিছু বিপাকজনিত সমস্যার কারণেও এমনটি হতে পারে।
সঠিক রোগনির্ণয়ের জন্য স্পেক্ট বা পেট টেস্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের বিস্তার পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয় এবং এখন পর্যন্ত এমন কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি যা এই রোগ সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে পারে। মূলত মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের অভাবের কারণে এই রোগ হয়, যা অনেক সময় বিষণ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ডোপামিনের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে সেলেগেলিন এবং রিসেলেগেলিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহৃত হয়, যা ডোপামিনের অতিরিক্ত ভাঙন রোধ করে। জটিলতা বাড়লে এপোমরফিন ইনজেকশন বা কন্টিনিউয়াস ডোপামিন ইনফিউশন দেওয়া হয়। এছাড়া অরুচি বা বমির সমস্যায় ডমপেরিডন এবং রক্তচাপ কমে গেলে মিনারেলোকর্টিকয়েড ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ব্যথা বৃদ্ধি পেলে কন্ট্রোলড রিলিজড ডোপামিন এবং স্মৃতিভ্রমের ক্ষেত্রে রিভাস্টিগমিন, কিউটাপাইন বা ক্লোজাপাইন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
যদি সর্বোচ্চ মাত্রার ওষুধেও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তবে নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে 'ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন' একটি কার্যকর অস্ত্রোপচার। এই পদ্ধতিতে রোগীর বুকের চামড়ার নিচে একটি ইলেকট্রিক্যাল ডিভাইস স্থাপন করা হয় এবং মাথার খুলি ছিদ্র করে তারের মাধ্যমে ব্রেনের ভেতরে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া লিসনেকটমি নামক আরেকটি অস্ত্রোপচার করা যায়। এই পদ্ধতিগুলো ব্যয়বহুল হলেও রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
ইনজেকশনের ভয় পাওয়া রোগীদের জন্য বর্তমানে সুইবিহীন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে ওষুধ প্রচণ্ড গতিতে ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, যা চুলের চেয়েও সরু এবং এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সম্পন্ন হয়। এতে রোগীর কষ্ট হয় না এবং কার্যকারিতাও বেশি।
বর্তমান সময়ে বয়স্কদের জন্য পারকিনসনস একটি বড় সমস্যা। তবে হতাশাগ্রস্ত না হয়ে শুরুতেই সচেতন হওয়া এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সুস্থ থাকার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
— অধ্যাপক ডা. হারাধন দেবনাথ, নিউরোসার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।