লোহা, তামা বা রুপার মতো অনেক ধাতুই সময়ের সঙ্গে বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে রং বদলে ফেলে বা মরিচা ধরে। কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এমনটি প্রায় কখনোই দেখা যায় না। শত শত, এমনকি হাজার বছরের পুরোনো স্বর্ণের অলংকার বা মুদ্রাও আজও উজ্জ্বল থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে স্বর্ণের অনন্য রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং পরমাণুর বিশেষ গঠন, যা এটিকে সহজে অন্য উপাদানের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে দেয় না।
স্বর্ণ হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে মূল্যবান ধাতু। প্রাচীন সভ্যতার তৈরি স্বর্ণের মুদ্রা, অলংকার কিংবা নিদর্শন আজও প্রায় আগের মতোই চকচকে দেখা যায়। কিন্তু লোহা যেমন মরিচা ধরে, রুপা যেমন কালচে হয়ে যায়, স্বর্ণ কেন তেমন হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আরও গভীরভাবে গবেষণা করেছেন।
নতুন গবেষণায় জানা গেছে, শুধু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নয়, স্বর্ণের পরমাণুগুলোর বিশেষ বিন্যাসও এটিকে মরিচা ধরা থেকে রক্ষা করে। ফলে স্বর্ণ দীর্ঘ সময় ধরে তার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারে।
মরিচা আসলে কী?
মরিচা হলো এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া, যাকে জারণ বা অক্সিডেশন বলা হয়। যখন কোনো ধাতু বাতাসের অক্সিজেন বা আর্দ্রতার সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন তার পৃষ্ঠে নতুন যৌগ তৈরি হয়।
লোহার ক্ষেত্রে এই বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় আয়রন অক্সাইড, যাকে আমরা মরিচা বলি। রুপার ক্ষেত্রে সালফারের সঙ্গে বিক্রিয়া হয়ে কালচে আস্তরণ পড়ে। কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এমনটি সাধারণত ঘটে না।
স্বর্ণ কেন অক্সিজেনের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করে না?
স্বর্ণকে বিজ্ঞানীরা নোবেল মেটাল বা অভিজাত ধাতু বলে থাকেন। এর ইলেকট্রনগুলো খুব দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। ফলে বাতাসের অক্সিজেন সহজে স্বর্ণের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করতে পারে না।
এ কারণেই সাধারণ পরিবেশে স্বর্ণে মরিচা ধরে না, রংও বদলায় না। হাজার বছর মাটির নিচে বা পানির নিচে থাকলেও বিশুদ্ধ স্বর্ণ তার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারে।
নতুন গবেষণায় কী জানা গেছে?
টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখেছেন, স্বর্ণের পৃষ্ঠের পরমাণুগুলো স্থির থাকে না। অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে তারা নিজেদের এমনভাবে সাজিয়ে নেয়, যাতে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের ভাষায়, এই পরমাণুগুলোর বিশেষ বিন্যাস স্বর্ণের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর তৈরি করে। এতে জারণের গতি লক্ষ-কোটি থেকে ট্রিলিয়ন গুণ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তাহলে কি সব স্বর্ণের গয়নাই সব সময় চকচকে থাকে?
না, সব সময় নয়।
২৪ ক্যারেট স্বর্ণ প্রায় বিশুদ্ধ হওয়ায় এতে মরিচা বা কালচে ভাব আসে না। কিন্তু ২২, ১৮ বা ১৪ ক্যারেটের গয়নায় শক্তি বাড়ানোর জন্য তামা, রুপা বা অন্য ধাতু মেশানো হয়।
এই মিশ্র ধাতুগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিছুটা কালচে হতে পারে বা উজ্জ্বলতা কমে যেতে পারে। অনেক সময় ধুলাবালি, ঘাম, প্রসাধনী কিংবা সাবানের আস্তরণ জমেও গয়না মলিন দেখায়।
স্বর্ণ কোথায় কোথায় ব্যবহার করা হয়?
স্বর্ণ শুধু অলংকার তৈরিতেই নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ক্ষুদ্র সংযোগ অংশে
মহাকাশযান ও স্যাটেলাইটে
চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বিশেষ যন্ত্রে
উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণায়
স্বর্ণ সহজে ক্ষয় না হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ ভালো পরিবাহিতা থাকায় এসব ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
স্বর্ণের গয়না ভালো রাখতে কী করবেন?
যদিও স্বর্ণ সহজে নষ্ট হয় না, তবু কিছু অভ্যাস গয়নার উজ্জ্বলতা দীর্ঘদিন ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
আলাদা নরম কাপড় বা বক্সে সংরক্ষণ করুন।
প্রসাধনী, পারফিউম বা রাসায়নিক ব্যবহারের পর গয়না পরুন।
মৃদু সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।
শক্ত ব্রাশ বা ক্ষয়কারী রাসায়নিক ব্যবহার করবেন না।
নিয়মিত জুয়েলার্স দিয়ে পরিষ্কার করাতে পারেন।
স্বর্ণের দীর্ঘস্থায়ী উজ্জ্বলতার রহস্য শুধু এর মূল্যবান হওয়ায় নয়, বরং এর অনন্য বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও লুকিয়ে আছে। স্বর্ণ যেমন স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেনের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করে না, তেমনি এর পরমাণুগুলোও নিজেদের এমনভাবে সাজিয়ে নেয়, যা এটিকে আরও বেশি সুরক্ষা দেয়। এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বর্ণ তার সৌন্দর্য ও মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র: টিভি ৯