স্তন ক্যানসার যদি শরীরের অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে না পড়ে, তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে এই রোগের চিকিৎসার ফলাফল অনেক বেশি ইতিবাচক হয়। এসকেএফ অনকোলজি আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনায় এই কথা বলেন বিআরবি হসপিটালসের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন।

গত সোমবার মুক্তকণ্ঠ ও এসকেএফ-এর ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় ‘বিশ্বমানের ক্যানসার–চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি, যার আয়োজন ছিল মুক্তকণ্ঠ ডটকমের। নাসিহা তাহসিনের উপস্থাপনায় আয়োজিত এই আলোচনায় বাংলাদেশের স্তন ক্যানসারের বর্তমান পরিস্থিতি, প্রাথমিক লক্ষণ, স্ক্রিনিং, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পুনর্বাসন এবং সচেতনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল বার্তা ছিল নিয়মিত স্ক্রিনিং ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিহ্নিত করার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, "স্তনের যেকোনো অংশে নতুন গুটি বা শক্ত অংশ অনুভূত হওয়া, স্তনের আকৃতির পরিবর্তন কিংবা বগলে গুটি দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক রোগী এসব পরিবর্তনকে সাধারণ সমস্যা মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, অথচ দ্রুত শনাক্তকরণ চিকিৎসার ফল অনেক ভালো করে। সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "নিজের স্তন নিজেই নিয়মিত পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ, প্রথম পরিবর্তনটি একজন নারী নিজেই সবচেয়ে আগে বুঝতে পারেন।"

সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অধ্যাপক ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই এই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। তাঁর মতে, যাঁদের পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ৪৫ বছর বয়সের পর থেকে এবং অন্যদের ৫০ বছর বয়সের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং করা উচিত।

ক্যানসার যদি শুধু স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, এমন অনেক রোগী আছেন যাঁরা চিকিৎসার বহু বছর পরও সুস্থ জীবনযাপন করছেন। ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি শরীরে হরমোনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গেও এই রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্তন ক্যানসার যে শুধু নারীদের রোগ নয়, সে বিষয়ে আলোকপাত করে ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, পুরুষদেরও এই রোগ হতে পারে, যদিও নারীদের তুলনায় তাদের আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক কম। তবে পরিবারে নির্দিষ্ট জিনগত ঝুঁকি থাকলে পুরুষদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি সম্পর্কে তিনি জানান, সব রোগীর ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণের প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুধু টিউমার অপসারণ করেই চিকিৎসা সম্ভব, যা ফলাফলের দিক থেকেও কার্যকর। বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনো থেরাপিসহ আধুনিক চিকিৎসা বিশ্বমানের গাইডলাইন অনুসরণ করে দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন করার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, "সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সময়মতো চিকিৎসাই স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।"