গত রোববার শেষ হয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত বিশ্বকাপ। গুগল ট্রেন্ডসের তথ্যমতে, ২০০৪ সাল থেকে হিসাব করলে এবারের আসরটিই ছিল বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি খোঁজা বা সার্চ করা বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের টুর্নামেন্ট নিয়ে সার্চের হার প্রায় দ্বিগুণ বা ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

টুর্নামেন্টে অংশ না নিলেও জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা হয়েছে গুয়াতেমালায়। অন্যদিকে, আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে মেক্সিকোতে সার্চের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। কানাডায় সার্চের পরিমাণ ছিল মেক্সিকোর ৬২ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছিল ৪৭ শতাংশ।

ব্রাজিলের ইএসপিএম (ইসকোলা সুপিরিয়র দে প্রোপাগান্ডা ই মার্কেটিং)-এর ক্রীড়া বিপণনবিষয়ক অধ্যাপক ইভান মার্তিনিওর মতে, এটি বিশ্বকাপকে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া আসরে পরিণত করার লক্ষ্যে ফিফার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই প্রতিফলন। একইসঙ্গে টুর্নামেন্ট ঘিরে দর্শকদের আচরণেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মার্তিনিওর ভাষায়, ‘আগে বিশ্বকাপ ছিল মূলত সম্প্রচারের একটি পণ্য। মানুষ খেলা দেখত, পরে তা নিয়ে আলোচনা করত, রাস্তাঘাট সাজাত, দলকে সমর্থন দিত। এখন এটি অংশগ্রহণের আয়োজন। মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত জানাতে চায়, নিজেরা কনটেন্ট তৈরি করে, আর স্পনসর ব্র্যান্ডগুলোও সেই আলোচনায় যুক্ত হয়। এখন বিশ্বকাপ শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই।’

অধ্যাপক মার্তিনিওর মতে, গ্লোবো, এসবিটি, ইউটিউব, ক্যাবল টিভি ও বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মতো সম্প্রচারের বৈচিত্র্যের কারণে ব্রাজিলে এবার মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।

বিশ্বকাপ জয় কিংবা সর্বোচ্চ গোলদাতার ট্রফি না পেলেও ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা হয়েছে ৩৮ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচ দলের তারকা এবং টুর্নামেন্টের অন্যান্য আলোচিত খেলোয়াড়দের গড় সার্চের হিসাবে মেসি সবার ওপরে অবস্থান করছেন।

গত ১৯ জুলাই ফাইনালের দিন মেসিকে ঘিরে সার্চের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে আটকে রাখা হলেও পুরো টুর্নামেন্টে মেসির ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট ছিল। আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে তোলায় তাঁর মুখ্য ভূমিকার কারণেই মানুষের আগ্রহ বেড়েছে বলে মনে করা হয়।

এই প্রসঙ্গে মার্তিনিও বলেন, ‘মেসির ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিয়ার ব্রাজিলিয়ানদের কাছে সব সময়ই আকর্ষণীয়। তিনি এমন সব ক্লাবে খেলেছেন, যেগুলোর ব্রাজিলে বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। এটি যেহেতু তাঁর শেষ বিশ্বকাপ ছিল, তাই মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। অনেকটা জনপ্রিয় কোনো ধারাবাহিক নাটকের শেষ পর্ব দেখার মতো। প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ানই চাইতেন, মেসি যদি আর্জেন্টিনার না হয়ে ব্রাজিলের হয়ে খেলতেন!’

মেসির পর ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা হয়েছে নরওয়ের আর্লিং হলান্ডকে। শেষ ষোলোতে তাঁর জোড়া গোলে ব্রাজিল বিদায় নেয়। হলান্ডকে নিয়ে তৈরি হওয়া নানা মিম ও কৌতূহল তাঁকে দীর্ঘ সময় আলোচনায় রেখেছে। নরওয়ে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত একসময় সার্চের হিসাবে মেসিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন হলান্ড।

ব্রাজিলের সার্চ তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। মেসির মতো তিনিও খেলেছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, তবে শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১–০ গোলে হেরে তাঁর যাত্রা শেষ হয়।

পরের স্থানে আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (২২ গোল) হয়েছেন। এরপর আছেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি শৈশবে মেসির সঙ্গে তোলা বিখ্যাত গোসলের ছবি এবং তাঁর তিন বছর বয়সী ভাই কেইনের ভাইরাল ভিডিও-ছবি তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে।

ব্রাজিলের সার্চ তালিকার শেষ দিকে রয়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ৩২ বছর বয়সী হ্যারি কেইন। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে হারালেও তিনি মাঠে নামেননি।

হ্যারি কেইনের ঠিক ওপরে ছিলেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দের হয়ে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন এবারের আসরের অন্যতম বড় আবিষ্কার।