দিনভর ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি। সন্ধ্যার দিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে তেলের সংকট আবারও চরম আকার ধারণ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জেলার এমন গুজব প্রচার হতেই বুধবার (২২ জুলাই) উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে তেলের পাম্পগুলোতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভিড় জমান মোটরসাইকেল চালকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। তবে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৯৫ ভাগ।
রাত যতই গভীর হয়, তত বাড়ে ভিড়। কার আগে কে তেল নিতে পারেন, শুরু হয় সেই প্রতিযোগিতা। মোটরসাইকেল চালকদের অনেকে ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা, কেউবা ফুল ট্যাংক তেল নিয়ে বাসায় ফেরেন।
এমনই চিত্র দেখা মেলে জেলার সদর, বোদা ও আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন পাম্পে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে গভীর রাত পর্যন্ত তেল নেন মোটরসাইকেল চালকেরা।
শুধু বুধবার রাতেই নয়, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকেও তেল সংগ্রহে ভিড় করেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। অনেকেই বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দেখে জ্বালানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় আগেভাগেই তেল ভরে রাখছেন তারা।
হঠাৎ অতিরিক্ত চাপে জেলা শহরের সেতারা ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন, করতোয়া ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেনের মজুত শেষ হওয়ায় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য পাম্পেও চালকেরা ভিড় করায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল কেনায় পাম্পে মজুত তেল শেষ হওয়ার পথে। তবে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।
মর্তুজা আল মামুন নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, গাড়ির তেল শেষের পথে, আজকের দিনটি শুধু চলবে। আবার শুনছি তেল নাকি সংকট। সবার দেখাদেখি আমিও পাম্পে এসে এক হাজার টাকার তেল নিলাম। কারণ সব সময় তো মোটরসাইকেল চালাতেই হয়।
আমিনুল ইসলাম নামে আরেক মোটরসাইকেল চালক বলেন, গতকাল রাতে ঠাকুরগাঁও থেকে বালীয়াডাঙ্গী হয়ে পঞ্চগড়ে আসার পথে পাঁচটি পাম্পে তেল পাইনি। তাই সকালে পঞ্চগড়ে ৬০০ টাকার তেল নিলাম। মোটরসাইকেল তো চালাতেই হয়। তেলের দামও বেশি। তবে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে নাকি গুজব ছড়াচ্ছে, এতকিছু জানি না।
তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে এখন পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। গুজবের কারণে হঠাৎ করেই গ্রাহকের চাপ বেড়েছে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড় এসবি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যখন জানানো হয় ৩৬ দিনের পেট্রোল-অকটেন এবং ৩০ দিনের ডিজেল মজুত আছে, এ খবর জেনে হয়তো যানবাহন চালকেরা পাম্পে তেল নিতে ভিড় শুরু করছেন। তবে আমাদের যা তেল আছে তা সবার চাহিদা অনুযায়ী দিচ্ছি। কিন্তু তেল শেষ হলে তো নতুন করে না আসা পর্যন্ত দিতে পারব না। তাই সরকারের উচিত দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
এদিকে তেল সংকটের গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বুধবার রাতে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন। এতে বলা হয়েছে, পঞ্চগড় জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। এ অবস্থায় গুজব, বিভ্রান্তিকর বা ভিত্তিহীন তথ্যের প্রভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ক্রয় বা মজুত না করার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল ক্রয় করতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনা বা মজুত করলে বাজারে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থি। স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন পঞ্চগড় সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সমন্বয়ে জ্বালানি তেলের মজুত, সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি কিংবা বাজার অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কোনো ধরনের অসাধু কার্যকলাপে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসন সর্বসাধারণকে গুজবে কান না দিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল ক্রয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে।
পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম ইমাম রাজী টুলু বলেন, জেলায় তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। কেউ গুজব ছড়ালে কিংবা মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।