যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বিস্তৃত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত বুধবার দুই দেশ এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছিল, এই নতুন চুক্তি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে কয়েকশ কোটি ডলারের ব্যবসার পথ প্রশস্ত হবে, যার প্রাথমিক সুফল পেতে পারে নকশা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের পর দ্রুতই মার্কিন কংগ্রেসের সামনে চুক্তির বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে।

চুক্তিটি রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন পেলেও ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালে সৌদি আরব ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে।

এই চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল। জো বাইডেন প্রশাসনের সময় এটি একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্যাকেজের অংশ ছিল, যার শর্ত ছিল সৌদি আরব ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ট্রাম্প এমন কিছু শর্তে সম্মত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। এর ফলে "কোনো পারমাণবিক স্থাপনা থেকে অস্ত্র তৈরির কাজে পারমাণবিক জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করাটা পরিদর্শকদের জন্য কঠিন হতে পারে।"

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলা এবং তার জবাবে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাব থেকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্তটি সরিয়ে দেন।

চুক্তিটি কার্যকর হতে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট অনুযায়ী কংগ্রেস আপত্তির প্রস্তাব আনতে পারে, তবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে এটি অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে সম্মত হয়েছেন, যার পর সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই চুক্তির শর্ত ছিল অনেক বেশি কঠোর। "আমিরাত কর্তৃপক্ষ তখন ওই দেশে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের কাজ করতে দিতে সম্মত হয়েছিল। এ জন্য সংস্থাটির সঙ্গে ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ নামে পরিচিত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আরব আমিরাত।"

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এই চুক্তির খবর প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর আগে সতর্ক করেছিলেন, "ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও তা করবে।" এমনকি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, "নিঃসন্দেহে সৌদি আরব এটা করবে।"

ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করলেও, ২০১৮ সালে ট্রাম্প ওবামা আমলের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর তেহরান উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করেন।

গত বছরের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠকের পর বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে একমত হওয়া হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি চুক্তির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। চুক্তির সাথে দুটি গোপন সম্পূরক নথি রয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ করতে চায় না, যদিও কংগ্রেসের কিছু সদস্য তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

এই চুক্তিটি একটি ‘ওয়ান-টু-থ্রি অ্যাগ্রিমেন্ট’ ধাঁচের কাঠামো, যার মূল উদ্দেশ্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা। বর্তমানে ৫১টি দেশ এবং আইএইএ-র সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন ২৬টি চুক্তি রয়েছে। তবে আমিরাতের চুক্তিতে জ্বালানি উৎপাদনের অধিকার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও নজরদারির কথা বললেও, বুশ ও ওবামা আমলের কঠোর শর্তগুলো শিথিল করা হয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে থমাস জে ব্যারাক জুনিয়র সৌদি আরবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিলেও সৌদি আরবের অনাগ্রহে তা এগোয়নি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট সৌদি আরব সফর করে যুবরাজের সঙ্গে আলোচনা করেন।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গত মে মাসে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য আকাশসীমা ব্যবহারে সৌদি আরবের অস্বীকৃতির ফলে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তবে এই পারমাণবিক চুক্তি সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব একটি সিনেট-অনুমোদিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষাচুক্তি এবং উন্নত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রাপ্তির বিষয়ে আগ্রহী। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ নীতি নিয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, যার ফলে তারা চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে।