ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাস্তায় গতকাল বুধবার গভীর রাতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের পুনরায় সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুসারে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠির প্রয়োগ করে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ একত্রিত হয়েছেন। মে মাসে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে সদ্যগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র সমর্থকেরা এই আন্দোলন শুরু করেন। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতারা।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই প্রথম তরুণ প্রজন্মের এমন বড় আন্দোলনের মুখে পড়লেন, যা এখন তাঁর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সরব হয়েছে।

গত মঙ্গলবার বিকেলে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এসময় পুলিশ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজনকে আটক করে, তবে পরবর্তীতে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে গত সোমবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সংসদের দিকে পদযাত্রা করলে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও লাঠির মাধ্যমে তাঁদের পিছু হটানোর চেষ্টা করে।

গতকাল বুধবার সকাল থেকেই জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দিতে দিতে হাজার হাজার মানুষ যন্তর মন্তর ও সংসদের বাইরে জড়ো হতে থাকেন। সন্ধ্যার পর ভিড় ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেলে তা আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের বেসরকারি সংবাদ সংস্থা এএনআই দিল্লি পুলিশের বরাতে দাবি করেছে, গভীর রাতে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল ছুড়ে মারেন, যাতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) স্থানীয় সাংবাদিক ও অন্যদের শেয়ার করা ভিডিওতে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার দেখা গেছে। তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

মূলত অনলাইন স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ হিসেবে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টিতে (সিজেপি) শুরুতে মাত্র কয়েক শ তরুণ যুক্ত ছিলেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁদের প্রতিবাদ চলবে। গতকাল গভীর রাতে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজ ২৫ দিন হলো। যদি ২৫ মাসও লাগে, তবু আমরা রাজি। কিন্তু আমরা এখান থেকে সরব না।”

নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে আজ বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি ও তার আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রোরেল কর্পোরেশন। চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এত বড় পরিসরে স্টেশন বন্ধ করা হলো।

বিক্ষোভের মুখে মোদি সরকার সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এক দফা আলোচনা করে দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে এবং সংসদে বিতর্ক ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, অতীতে এমন ঘটনা ঘটলেও সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি এবং এবারের আন্দোলনেও শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবি আমলে নেওয়া হয়নি।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে। রাহুল গান্ধী মোদির বাসভবন ও সংসদ ভবনের বাইরে প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিয়ে বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।” সংসদে বিরোধীদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে আজ সকালে শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

চাকরির অভাব এবং ঘনঘন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের কারণেই সিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি বিরোধী দলগুলোর জন্য মোদি ও ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) চাপে ফেলার একটি বিরল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, তরুণ ভোটাররা বিজেপির মূল সমর্থকভিত্তি হলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি, যদিও পরবর্তী বেশ কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে দলটি জয়ী হয়েছে।