দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ সাগর খান। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা সাগরের এই সাফল্য এখন অনেকের অনুপ্রেরণা, তবে এই খুশির মুহূর্তে তাঁর পাশে নেই সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি—তাঁর মা।

সাগরের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামে। তাঁর বাবা আকবর খান পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় সাগর। তাঁর বোন আইরিন বেগম গৃহিণী এবং ছোট দুই ভাই মোহাম্মদ রাব্বি খান ও সাব্বির খান দুটি ব্যাংকে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত।

শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। কহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকার ধামরাই উপজেলার রাজাপুর–কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি পাস করেন। সে সময় তিনি বৃত্তিও লাভ করেন। পরবর্তীতে রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০২৪ সালে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।

মায়ের স্বপ্ন পূরণের তাড়না এবং কঠোর পরিশ্রমের কথা স্মরণ করে সাগর বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপি ও হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেছি। কেরোসিন না থাকলে দিনের আলোতেই পড়তাম। এসএসসির পর টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। রাজাপুর গ্রামের গৃহশিক্ষক হৃদয় খান আমাকে পড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন।’

সাগর জানান, গত বছরের ২ জুলাই তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৯ দিন পর তাঁর মা সেলিনা বেগম মারা যান। এর আগে ৪৬তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেলেও মায়ের স্বপ্ন পূরণে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যান তিনি। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে মেধাতালিকায় ৩৫তম স্থান অধিকার করে সেই লক্ষ্য অর্জন করেন।

বড় ভাইয়ের এই সাফল্যে গর্বিত ছোট ভাই সাব্বির খান। তবে মা পাশে না থাকায় আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। ভাইয়ের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন আমাদের মা।’

সাগরের নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কথা জানান তাঁর বন্ধু কল্লোল খান। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ওকে যেভাবে দেখেছি, তা অবাক করার মতো। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য অর্জনে তার অসাধারণ নিষ্ঠা ও একাগ্রতা ছিল। অন্যদের মতো এত সাধারণ ছিল না।’

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আকবর খান বলেন, ‘আমার মতো অভাবীর ঘরে আল্লাহ চাঁদের আলো দিয়েছেন। অভাবের কারণে সব সময় আমি ওর আবদার পূরণ করতে পারতাম না। তবে ওর চাহিদা যে এত সুন্দর হইব, তা কহনো ভাবতেও পারি নাই। ও আমাগো সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমি চাই, ও সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করুক।’

সাগরের এই অর্জনকে সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন রাজাপুর–কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ আবদুল খালেক। তিনি বলেন, ‘সাগর শুধু আমাদের বিদ্যালয়ের নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয়। এটি প্রমাণ করে, পরিস্থিতি নয়, ইচ্ছাশক্তিই সাফল্যের মূল।’