বিশ্বকাপের বছরগুলোতে ব্যালন ডি’অরের হিসাব-নিকাশে প্রায়ই বড় পরিবর্তন আসে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সের চেয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চের প্রভাব হয়ে দাঁড়ায় বেশি। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর সেই আলোচনা আবারও শুরু হয়েছে। স্পেনের শিরোপা জয়ের ফলে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইয়ে নতুন মোড় এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্প্যানিশ দৈনিক মার্কার বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে শীর্ষ দাবিদারদের একটি তালিকা করা হয়েছে। সেখানে লিওনেল মেসি, লামিনে ইয়ামাল, রদ্রি, হ্যারি কেইন ও কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম রয়েছে। এছাড়া পারফরম্যান্সের কারণে উসমান দেম্বেলেকেও হিসাবের বাইরে রাখা যাচ্ছে না। তবে বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন দুই স্প্যানিশ তারকা।
এসিএলের চোট কাটিয়ে সর্বশেষ মৌসুমে মাঠে ফিরেছিলেন রদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ভালো খেলার পাশাপাশি বিশ্বকাপের মঞ্চটি ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড়। টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি হন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় (এমভিপি)। ১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপে একজন খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ বল স্পর্শ, সফল পাস এবং আক্রমণভাগে সফল পাসের রেকর্ড গড়েছেন রদ্রি। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের রক্ষণে মাত্র এক গোল হজম করার পেছনে ৩০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের বড় অবদান ছিল।
অন্যদিকে, মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ক্লাব ও জাতীয় দল—উভয় জায়গাতেই দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার হয়ে ২৪ গোল ও ১৭ অ্যাসিস্ট করে তিনি জিতেছেন লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। বিশ্বকাপে স্পেনের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে সৌদি আরবের বিপক্ষে দলের প্রথম গোলটি করেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবলের রেকর্ডও তাঁর দখলে। এছাড়া ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি আদায় করেন তিনি। মার্কার মতে, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ইয়ামালের অর্জনের তালিকাই তাঁকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদারে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো আছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে টেনে তুলেছেন তিনি। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করা মেসির জন্য এটি ছিল তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। মার্কার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নবম ব্যালন ডি’অর জিতলে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী বিজয়ীও হবেন মেসি। তবে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা গোলশূন্য থাকায় তাঁর দাবি কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে বরাবরের মতোই উজ্জ্বল হ্যারি কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৩৬ গোল করে লিগ ও কাপের ডাবল জিতেছেন তিনি। বিশ্বকাপে ৬ গোল করে গ্যারি লিনেকারের ইংল্যান্ডের হয়ে বড় টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙেছেন কেইন। কেইনের নিজের মতেই এটি তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম, তাই ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তিনি বেশ জোরালো অবস্থানে আছেন।
ব্যক্তিগত অর্জনে ভরপুর মৌসুম কাটিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং ১০ গোলে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ী। এরই মধ্যে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তবে দলগত অর্জনে তাঁর শূন্যতা স্পষ্ট। রিয়াল মাদ্রিদ কোনো শিরোপা জিততে পারেনি এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপ অভিযান সেমিফাইনালে শেষ হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান দুর্দান্ত হলেও শিরোপার অভাবে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন।
গত বছর ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে দীর্ঘ সময় চোটের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তবে পিএসজির হয়ে ২২ ম্যাচে ১০ গোল করেছেন তিনি এবং দল জিতেছে চ্যাম্পিয়নস লিগ। এরপর ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপে ট্রফি জিততে না পারলেও একটি হ্যাটট্রিকসহ ৬ গোল করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপের পর ব্যালন ডি’অরের সমীকরণ পরিবর্তনের আলোচনা পুরনো হলেও, এবারের ফাইনালের পর ব্যালন ডি’অরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট মনে করিয়ে দিয়েছে যে, কেবল বিশ্বকাপ জিতলেই ব্যালন ডি’অর নিশ্চিত হয় না; বরং পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবুও স্পেনের বিশ্বকাপ জয় রদ্রি ও লামিনে ইয়ামালকে আলোচনার সামনে নিয়ে এসেছে।
আগামী ২৬ অক্টোবর লন্ডনের অনুষ্ঠানে জানা যাবে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ীর নাম।