রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।

বঙ্গভবন সূত্র বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে তার সুবিধাজনক সময়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগের বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।

একই সঙ্গে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছে।

বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। তিনি বলেন, পদত্যাগের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে এখনও পদত্যাগের তারিখ ঠিক হয়নি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই পদত্যাগপত্র যথাযথ প্রক্রিয়ায় জমা দেবেন। আমরা এখন ব্যাগ গোছাচ্ছি।

বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি সূত্র জানিয়েছে, পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন।

মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার পতনের সময় থেকেই জামায়াত-এনসিপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পক্ষে ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রক্রিয়া না চালিয়ে সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ ছিল। বিএনপিও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি কীভাবে পদত্যাগ করবেন

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। যদি সে সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার দায়িত্ব পালন করতে অপারগ হন বা পদটি শূন্য থাকে, তাহলে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।

এর মধ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি শোনা যাচ্ছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা—এসব বিবেচনা থেকে তার নাম সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা আরও আলোচনা করবেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণ, রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে অভিভাবকত্ব প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী দেশে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন এবং নতুন সরকারকে শপথ পাঠ করান।