ঢাকা-বেনাপোল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ (৭৯৫/৭৯৬)-এর যাত্রাবিরতিতে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিনের দাবির মুখে কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলওয়ে স্টেশনে নতুন করে ট্রেনটির যাত্রাবিরতি মঞ্জুর করা হলেও বাদ পড়েছে পাশের উপজেলা খোকসা রেলওয়ে স্টেশন। একটি উপজেলার দীর্ঘদিনের সুবিধা বাতিল করে পার্শ্ববর্তী উপজেলায় স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্তে কুষ্টিয়ার দুই উপজেলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
তবে খোকসায় পুনরায় যাত্রাবিরতি চালুর কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক।
বুধবার (২২ জুলাই) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি জানানো হয়। এতে বলা হয়, ট্রেনটির আয়, আসন ব্যবহার, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও জনস্বার্থ বিবেচনা করে খোকসা রেলওয়ে স্টেশনের পরিবর্তে কুমারখালী স্টেশনে যাত্রাবিরতির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
কুমারখালী ও খোকসা—এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৫ জন। এর মধ্যে কুমারখালীতে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭৮ জন এবং খোকসায় ১ লাখ ২০ হাজার ২৮৭ জন ভোটার রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে উল্লাস দেখা গেছে কুমারখালীতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের তীর্থভূমি কুমারখালী একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্য ও তাঁতশিল্প এলাকা। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর এমন সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের মনে।
কুমারখালীর বস্ত্র ব্যবসায়ী আলহাজ পারভেজ হোসেন বলেন, আমাদের নিয়মিত ঢাকা ও বেনাপোলে যাতায়াত করতে হয়। কুমারখালীতে ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হওয়ায় ব্যবসার প্রসারে নতুন গতি আসবে। তবে প্রতিবেশী খোকসা স্টেশনের সেবাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খারাপও লাগছে।
একই সুর কুমারখালীর সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চুর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর কুমারখালীতে ট্রেন যাত্রাবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় আমরা খুব আনন্দিত। কুমারখালীবাসীর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে খোকসার স্টপেজ বন্ধ করে দেওয়াটা দুঃখজনক। এটি পুনরায় বিবেচনা করার জন্য রেলমন্ত্রীর নিকট বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।
অন্যদিকে হঠাৎ করে যাত্রাবিরতি বাতিল করায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোকসার বাসিন্দারা। ঢাকার সাথে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন তারা।
খোকসার নিয়মিত ট্রেনযাত্রী শামীমা আক্তার তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ঢাকা যাওয়ার জন্য বেনাপোল এক্সপ্রেসই ছিল আমাদের প্রধান ভরসা। এক উপজেলার সুবিধা বাড়াতে গিয়ে অন্য উপজেলার যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া কোনো যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য শরিফুল বলেন, খোকসা স্টেশন থেকেও পর্যাপ্ত যাত্রী হতো এবং সরকার ভালো রাজস্ব পেত। হুট করে স্টপেজ তুলে নেওয়ায় হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়বেন। আমরা চাই দুটি স্টেশনেই যাত্রাবিরতি বহাল রাখা হোক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীও খোকসা স্টেশনের যাত্রাবিরতি বহাল রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্তটি পুনরায় বিবেচনার আহ্বান জানান।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কুষ্টিয়ার খোকসা এবং কুমারখালী—দুই স্টেশনের মধ্যে আন্তনগর ট্রেনটি শুধু খোকসায় থামত। সম্প্রতি কুমারখালীর মানুষ আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের কাছে অফিশিয়ালি চিঠি দেয়। তাদের চিঠি পেয়ে আমরা বিষয়টি অনুসন্ধানের মাধ্যমে নানা দিক বিবেচনা করেছি। আমাদের পর্যবেক্ষণে এসেছে, খোকসার চেয়ে কুমারখালী স্টপেজ দিলে রেলের আয় এবং যাত্রী দুটোই বেশি হবে, অর্থাৎ আরও বেশি মানুষ রেলসেবার আওতায় আসবে। তাই খোকসার পরিবর্তে কুমারখালীতে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হয়েছে।
খোকসায় যাত্রাবিরতি পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না—এমন প্রশ্নে ফরিদ আহমেদ বলেন, আমরা তো আন্তনগর ট্রেনকে মেইল ট্রেনে পরিণত করতে পারি না। এতে সময় এবং অর্থ দুটোই অপচয় হবে। প্রতিটি স্টপেজে অন্তত ১০ মিনিট সময় অপচয় এবং আর্থিক খরচের ব্যাপার থাকে; তাই খোকসার মানুষকেও বুঝতে হবে কীভাবে বেশি মানুষ সেবা পাবে। রেল ও যাত্রী সাধারণ—উভয়ের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খোকসায় পুনরায় স্টপেজ ফিরিয়ে আনার আর কোনো সুযোগ নেই।