কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নতুন যুগে আমাদের তরুণদের টিকে থাকতে হলে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার জানলে চলবে না, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রশ্ন করার ক্ষমতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনাকে উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সঠিক প্রশ্নটি করার জন্য যে সৃজনশীলতা ও যুক্তিবোধ প্রয়োজন, তা কেবল মানুষেরই থাকতে হবে। তরুণেরা যদি কৌতূহলী না হন, যদি তাঁরা তথ্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে কেন বা কীভাবে প্রশ্নটি ভুলে যান, তবে এআই তাঁদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে অলস করে তুলবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কেবল মুখস্থবিদ্যার জায়গা নয়, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও প্রশ্ন করার সাহসকে জায়গা দিতে হবে। এআই সক্ষমতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো মানুষের এই মৌলিক মেধা ও কৌতূহলকে শাণিত করা। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন, অথচ স্নাতক পর্যায়ের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ শতাংশ।
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে গ্রামীণফোন ও দ্য ডেইলি স্টারের যৌথ আয়োজনে ‘ফিউচার-রেডি বাংলাদেশ: এআই, স্কিলস অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়বিলিটি ইন দ্য ডিজিটাল ইকোনমি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এমন সব ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
.আগামী সময়ের ক্যারিয়ার ও নানা চ্যালেঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে বক্তারা জানান, কেবল ইন্টারনেট সংযোগ বা ডিজিটাল সরঞ্জামের সহজলভ্যতা দিয়ে এআই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি জাতীয় ইকোসিস্টেম, যা মানুষ ও সমাজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসান শিক্ষার্থীদের নতুন চ্যালেঞ্জ জানতে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেন। ক্যারিয়ার ও দক্ষতা বিকাশে প্রশ্ন করার আগ্রহ তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন।
সভায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জুলকারিন জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বিশ্বের ৭৮ শতাংশ সংস্থা এখন এআই ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন আমরা অন্যদের চেয়ে দ্রুত এআই সক্ষমতা অর্জন করতে পারব কি না। ডিজিটাল রেডিনেস বা প্রস্তুতির চেয়ে এখন বড় প্রয়োজন মানুষের সক্ষমতাকে এআই উপযোগী করে গড়ে তোলা।’
.গ্রামীণফোনের এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল ও গভর্ন্যান্স (ইএসজি) বিভাগের প্রধান ফারহানা ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক নিয়োগকর্তাদের দুই-তৃতীয়াংশ এখন এমন প্রার্থী খুঁজছেন, যাঁরা এআই ব্যবহারে দক্ষ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের তরুণদের প্রায় ৯০ শতাংশ এআই ব্যবহার করছেন মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিনোদনের কাজে, ক্যারিয়ার উন্নয়নের কাজে নয়। এই ব্যবধান দূর করতে গ্রামীণফোন একাডেমি ইতিমধ্যে ৩ লাখ ২৪ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে এই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে প্রয়োজন।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, ‘আমরা যদি দক্ষ না হই, তবে আমরা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকব, কিন্তু দক্ষ হলে আমরা দেশের উৎপাদনশীলতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারব। এআই অনেক রুটিন কাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, তাই তরুণদের নতুনভাবে দক্ষতা অর্জনে বিনিয়োগ না করলে বৈষম্য আরও বাড়বে।’
.বিশ্বের সেরা ১০ এক্সিকিউটিভ এমবিএ প্রোগ্রাম, অক্সফোর্ডসহ শীর্ষে আর কারা.প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকার একটি জাতীয় এআই নীতিমালা তৈরির কাজ করছে। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সভায় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের কথা তুলে ধরেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ না থাকায় বেকারত্ব কমছে না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। কেবল প্রযুক্তিগত শিক্ষা নয়, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ ও নৈতিক বিচারবুদ্ধি শেখানোই হবে এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
.সভায় গ্রামীণফোনের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার অটো ম্যাগনে রিসবাক আজকের তরুণদের ডিজিটাল নেটিভ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলে দিতে সক্ষম। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুতগতির এআই উদ্ভাবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগও জরুরি।
শিখোর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহির চৌধুরী বলেন, ‘কেবল মেশিন লার্নিং বা ডেটা সায়েন্স জানলেই হবে না, বরং লাখ লাখ মানুষের কাছে এআইকে সহজলভ্য করে তোলা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা কেবল আজকের চাকরির জন্য নয়, আগামীর নতুন সব সুযোগের জন্য তরুণদের প্রস্তুত করবে।’
.দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য যা করা যেতে পারে, যা শিখছি যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে