কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আলোচনা–সমালোচনায় সরগরম। এর মধ্যে চোখে পড়ল একটি ব্যানার, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন নিয়ে। সেই ব্যানারের দাবিসমূহ দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দাবির মধ্যে ছিল প্রশ্নপত্র কঠিন করা যাবে না। পরীক্ষার হলে অতিরিক্ত কড়া গার্ড দেওয়া যাবে না। পরীক্ষার ফলাফল দিতে হবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা করে। শিক্ষার্থীরাই যেন ঠিক করে দিচ্ছে, কীভাবে তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে চোখে পড়ল আরও কিছু ভিডিও। একজন নারী শিক্ষার্থী অত্যন্ত অশালীন ভাষায় শিক্ষামন্ত্রীকে, শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থাকে গালি দিচ্ছেন প্রকাশ্যে। এসব দেখে দেশের অন্য সব শিক্ষকের মতো আমারও শিক্ষক হিসেবে ভীষণ মন খারাপ হয়েছে। অথচ আমি এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহকর্মীদের আমার দেশের শিক্ষার্থীরা সীমিত সম্পদ ও সুযোগের মধ্যে কীভাবে পড়ছে, তার কথা বলে সবাইকে বিস্মিত করি।

.বিশ্বের সেরা ১০ এক্সিকিউটিভ এমবিএ প্রোগ্রাম, অক্সফোর্ডসহ শীর্ষে আর কারা.

গত এক দশকে দেশের শিক্ষা খাতে শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবক্ষয়ের ক্ষতির বিষয়টি সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হয় আমার। যেকোনো কিছু শিক্ষার্থীদের পছন্দের বাইরে গেলেই জ্বালাও–পোড়াও আন্দোলন আর অশালীন ভাষায় আক্রমণ যেন হাতিয়ার। আমার মনে হয়, শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে আবেগ প্রকাশ শেখা দরকার। প্রতিটি আচরণই যোগাযোগের অংশ। আমি যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি স্টেটে স্প্রিংফিল্ড আর-টুয়েলভ পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এ রিড মিডল স্কুলে (ক্লাস ৬-৮) যুক্ত আছি। আমার শিক্ষার্থীরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজের পরিসর আরও একটু বিস্তৃত। এর আগে আমি মিজৌরি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পড়িয়েছি আন্ডারগ্রাজুয়েট ক্লাসে। তখনো দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গত তিন বছরে আমেরিকান শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কারণে বেশ কিছু বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন নিয়ে আমার কিছু ভাবনা ভাগাভাগি করতে চাই। আমি যে স্কুলে পড়াই, তার শিক্ষার্থীরা সবাই প্রায় কিশোর-কিশোরী। এ বয়সের বাচ্চারা ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়। স্কুলে প্রায়ই দেখি, একে অন্যের সঙ্গে ছোটখাটো বিষয়ে মন–কষাকষি হলেও তাদের মনোমালিন্য কিংবা আবেগ প্রকাশে যে নিয়ন্ত্রণ, তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য এ চর্চা তারা বাড়িতে করে এবং স্কুলে তো বটেই। স্কুলে এসব বিষয় দেখার জন্য কিংবা কোনো শিক্ষার্থীর যদি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো সাহায্য প্রয়োজন হয়, স্কুল কাউন্সেলর, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিহেভিয়ার ইন্টারভেনশন স্পেশালিস্ট সব সময় তৈরি। আমেরিকান সব এলিমেন্টারি-হাইস্কুলে স্কুল কাউন্সেলর থাকেন। তাঁদের কাজ শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা দিয়ে ব্যক্তিগত সমস্যা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ দূর করতে সরাসরি কাউন্সেলিং করা। এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগহীনতা, অতিরিক্ত রাগ বা আচরণগত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করা। এ ছাড়া স্কুলে বুলিং বা উত্ত্যক্তের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তি জোগানো এবং এটি প্রতিরোধে কাজ করা হয়।

.
আমেরিকান স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলো নিয়মিত শিক্ষকদের প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং করায়। একটি নেতিবাচক কথার বিপরীতে তাঁরা তিনটি ইতিবাচক কথার পরামর্শ দেন। কোনো শিক্ষার্থী কোনো কারণে তার সহপাঠী কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে সহিংস আচরণ করলে সেই মুহূর্তে তাকে কীভাবে শান্ত করতে হবে।
.

কোনো শিক্ষার্থী যদি পারিবারিক কলহ বা কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়, তাকে বিশেষ মানসিক ও আবেগগত সমর্থন দিয়ে একাডেমিক অগ্রগতিতে সাহায্য করা। হঠাৎ পিছিয়ে পড়লে তার পেছনের কারণ খুঁজে বের করে সমাধানের পথ দেখানো। তাদের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রাণিত করা। তারা যখন মিডল স্কুল শেষে হাইস্কুলে যায়, সেখানেও স্কুল কাউন্সেলর সাহায্য করেন কোন হাইস্কুল তার জন্য ভালো হবে। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী ভবিষ্যতের পেশা বা ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার দিকনির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য এবং ভর্তিপ্রক্রিয়ার নিয়মকানুন সম্পর্কে জানানোও তাঁদের কাজের অন্যতম অংশ। তাঁরা প্রয়োজনে শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে সমন্বয় করে বাসায় শিক্ষার্থীদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন।

.যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদের নতুন নিয়ম, স্টেম ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা কি করবেন.

আমি দেখেছি, কোনো কোনো কাউন্সেলর ক্লাসে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলাদা করে ক্লাস করান। তাদের বুঝতে সাহায্য করেন, কেন সে পিছিয়ে পড়ছে অন্যদের চেয়ে। বাংলাদেশ ও আমেরিকায় যেটা কমন দেখেছি, তা হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক। আমি মনে করি এটা সর্বজনীন। যাঁরাই শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন, তাঁরা তাঁদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ।

.

এ ছাড়া আমেরিকান স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলো নিয়মিত শিক্ষকদের প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং করায়, যেগুলো নন–ভায়োলেন্ট ক্রাইসিস ইন্টারভেনশন ট্রেনিং নামে পরিচিত। একটি নেতিবাচক কথার বিপরীতে তাঁরা তিনটি ইতিবাচক কথার পরামর্শ দেন। এ ধরনের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষকেরা যেন শিক্ষার্থীদের জন্য সব সময় নিরাপত্তার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন। কোনো শিক্ষার্থী কোনো কারণে তার সহপাঠী কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে সহিংস আচরণ করলে সেই মুহূর্তে তাকে কীভাবে শান্ত করতে হবে, কীভাবে তার যোগাযোগদক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো যায়, ডিফেন্সিভ না হয়ে ডিরেক্টিভ কীভাবে হতে হয়, ব্যক্তিগত স্পেসে কীভাবে বাউন্ডারি সেট করতে হয়—শিক্ষার্থীদের এগুলো শেখানোও এ ধরনের প্রশিক্ষণের অংশ।

.

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা স্বল্প সুযোগে যে পরিমাণ ভালো করে, আমারিকান শিক্ষার্থীদের মতো সুযোগ পেলে তা নিশ্চয়ই বহুলাংশে বাড়ত। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো জনমনে তেমন সচেতনতা নেই। এমনকি বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার অবকাশই কারও নেই। তাতে করে যা হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই ভালো কিছু বয়ে আনছে না। শিক্ষার্থীরা জানে না আবেগের সঠিক প্রকাশের ধরন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতার যে ঘাটতি থাকে, তা তারা পরবর্তী জীবনেও বয়ে বেড়ায়। আসলে স্কুল কাউন্সেলর অথবা বিহেভিয়ার ইন্টারভেনশনিস্ট একজন সাইকোলজি গ্র্যাজুয়েট। স্কুলে যদি সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়, তাতে করে যেমন এই বিভাগ থেকে যাঁরা পাস করেন, তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে, তেমনি শিক্ষার্থীরা শিখবেন আবেগের নিয়ন্ত্রণ। এক দিনে নিশ্চয়ই কিছুই বদলাবে না, কিন্তু শুরুটা তো করা চাই। স্কুলের পাঠ্যবইয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন তুলে ধরে পাঠ্যসূচি সাজানো যেতে পারে। তাতে করি যদি আমরা এই বিশাল তারুণ্যের শক্তি ইতিবাচকতায় ফিরিয়ে আনতে পারি, তা সবার জন্যই মঙ্গলের।

*লেখক: ফারহানা মিষ্টি, শিক্ষক, রিড মিডল স্কুল (স্প্রিংফিল্ড আর-১২ স্কুল ডিস্ট্রিক্ট), স্প্রিংফিল্ড, মিজৌরি, যুক্তরাষ্ট্র

.যুক্তরাষ্ট্রের হামফ্রে ফেলোশিপ: মাসিক ভাতাসহ ৯ মাস পড়াশোনা, যাদের সুযোগ