চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর (সিএমবিসি) নিয়ে বেইজিংয়ের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর নতুন করে আলোচনায় আসে বিষয়টি। ওই সফরে নতুন করে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতার কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

সম্ভাব্য এই অর্থনৈতিক করিডর ঘিরে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে থাকা ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ট্রাম্প কার্ড হতে পারে এই করিডর। কেননা, এ ক্ষেত্রে বেইজিংকে দিয়ে নেপিদোকে চাপ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হতে পারে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘করিডরের প্রস্তাব চীনের প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে এসেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা এ বিষয়ে হোমওয়ার্ক করেছে। তারা হয়তো মিয়ানমারের সঙ্গেও কথা বলেছে।’

একই রকমের মত দিয়েছেন বাংলাদেশ-চীন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাবুল হক। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বলেন, ‘করিডর বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ বা চীনের সরকার ভারতের সঙ্গে কথা বলতে পারে। এ ছাড়া মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা করতেই হবে। সে ক্ষেত্রেও চীন সহায়তা করতে পারে।’

বেইজিংয়ের যুক্তি, এই সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প খাতে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য। জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও।

২০১৩ সালের প্রস্তাব

২০১৩ সালে ভারত সফরের সময় চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াং একটি করিডরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার নিয়ে গঠিত এই উদ্যোগের নাম ছিল বিসিআইএম। এ নিয়ে দীর্ঘদিন চার দেশের মধ্যে আলোচনা চলে।

পরিকল্পনা ছিল, চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত একটি স্থল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একে স্বাগত জানায়। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহে একপর্যায়ে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এই উদ্যোগ।

ওই আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় পরে ভারতকে বাদ দিয়েই এই অর্থনৈতিক সংযোগ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেয় চীন। ফলে দেশটির বর্তমান পরিকল্পনায় ভারতের নাম নেই। যদিও ভবিষ্যতে অন্য দেশ চাইলে এতে যুক্ত হতে পারবে বলে জানিয়েছে বেইজিং।

করিডরের সম্ভাব্য রুট

করিডরের সম্ভাব্য রুট নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, রুটটি চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে শুরু হবে। এরপর মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন অঞ্চল পার হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে গিয়ে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হতে পারে।

এই সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে বঙ্গোপসাগরে পণ্য পরিবহনের একটি বিকল্প স্থলপথ তৈরি হবে। বর্তমানে চীনের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চায় বেইজিং।

অর্থনৈতিক করিডর বলা হলেও এই প্রকল্প শুধু অর্থনীতিকেন্দ্রিক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাত। ফলে এটিকে শুধু অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ-চীন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাবুল হক বলেন, ‘ভারতের উদ্বেগের জায়গা আছে। পাকিস্তানের সি প্যাক (চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর) নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ভারতের। যুক্তরাষ্ট্রেরও উদ্বেগ থাকতে পারে। তাদের এই অঞ্চলে নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।’

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

করিডর বাস্তবায়নে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশ্লেষকরা। একটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। অন্যটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি।

মিয়ানমারের বাস্তবতা হলো, দেশটিতে কার্যত একক কোনো সরকার নেই। প্রস্তাবিত করিডর মিয়ানমারের এমন কিছু অঞ্চল অতিক্রম করবে, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী সক্রিয়। কিছু এলাকা রয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘর্ষের কারণে এই এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ বারবার বদলেছে।

একদিকে এই উদ্যোগ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রেও বাংলাদেশকে আরও বেশি করে সামনে নিয়ে আসতে পারে। এ কারণে অনেক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মনে করেন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কৌশলগত ঝুঁকির মূল্যায়নও গুরুত্বের সঙ্গে করা প্রয়োজন।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ভারত ততটা সমস্যা করবে না, যতটা করবে যুক্তরাষ্ট্র। দিল্লি কখনও চাইবে না ওয়াশিংটন তার সামরিক কাঠামো নিয়ে এই অঞ্চলে আসুক। কারণ নর্থ-ইস্ট (সেভেন সিস্টার্স ও সিকিম) নিয়ে ভারতের ঝামেলা আছে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখতে হয়তো চীন-ভারত একসঙ্গেও কাজ করতে পারে। করিডরের মূল বাধা যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো থেকেই আসবে।’

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ুক, সেটা যুক্তরাষ্ট্র চাইবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ না পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে একটি সুযোগ এবং একটি পরীক্ষা। অধ্যাপক ড. শাহাবুল হকের মতে, করিডর অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দারুণভাবে লাভবান হবে। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতা মাথায় রেখে এ বিষয়ে আরও ভাবার সুযোগ আছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সম্মতি এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বাধা না হলে করিডর বাস্তবায়ন সম্ভব।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হলে পণ্য পরিবহনের সময় ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে। এতে পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। এ ছাড়া করিডরের মাধ্যমে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ সহজ হবে। অর্থনৈতিক লাভ দেখলে ভারতও একসময় এতে যুক্ত হবে।’ তবে আপাতদৃষ্টিতে করিডর লাভজনক মনে হলেও এ বিষয়ে আরও হোমওয়ার্ক করার ওপর জোর দিয়েছেন ড. ইমতিয়াজ।