চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যতটা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে ততটা বাড়েনি। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ এমনকি ২০০ ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

বাস্তবে ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলার হলেও এবার তা অনেক কম ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ব্রেন্টের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। যুদ্ধবিরতির পর জুলাইয়ের শুরুতে দাম সাময়িকভাবে ৭০ ডলারে নেমে এলেও বর্তমানে তা পুনরায় বেড়ে ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে।

যুদ্ধের মাঝেও তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ার পেছনে প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. চীনের চাহিদা হ্রাস: বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীনের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়া একটি বড় কারণ। জুন নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি কমে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতে তেলের ব্যবহার কমার প্রভাব এখানে স্পষ্ট।

২. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বৃদ্ধি: বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক উৎপাদন এপ্রিল মাসে রেকর্ড ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে বাজারে তেল ছাড়ায় সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিট রপ্তানিকারকে পরিণত হয়।

৩. ট্রাম্পের বক্তব্যে বাজারের অনিশ্চয়তা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিচুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় তেল পরিবহনের সম্ভাবনা নিয়ে বারবার মন্তব্য করেছেন। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং অনেকেই বড় ধরনের মজুত বা বিনিয়োগে যাননি। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ইলিয়া বুচুয়েভ বলেন, "এখন সবাই মনে করছেন, তেলের দাম বাড়বে, কিন্তু কেউ বড় মজুত বা বিনিয়োগে যাচ্ছেন না।"

জুলাইয়ের শুরুতে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে দিলেও ১৪ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে পুনরায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। তবে তা মার্চের শেষ দিকের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে তেলের দাম বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় বাজারে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার, যা মার্চের শেষ দিকে এর দ্বিগুণের বেশি ছিল।

৪. হরমুজের বিকল্প পথ: সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমিয়ে এনেছে। জুন মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাময়িকভাবে তেল পরিবহন শুরু হওয়ায় সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগ কমেছিল, যদিও জুলাইয়ে যুদ্ধ তীব্র হলে জাহাজ চলাচল পুনরায় হ্রাস পায়।

৫. তাৎক্ষণিক সরবরাহে পর্যাপ্ততা: ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের উত্তর সাগরের ফোর্টিজ গ্রেডের তেল বর্তমানে প্রিমিয়ামের বদলে ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে, যা প্রমাণ করে বাজারে তেলের সংকট নেই এবং ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক কম। তবে ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।