যুক্তরাজ্যের বর্তমান বেস্টসেলার উপন্যাসের তালিকা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেখা গেছে, সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ১০টি কথাসাহিত্যের পেপারব্যাক বইয়ের মধ্যে ৯টিতেই অন্তত একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই সাহিত্যপ্রেমী, লেখক এবং সমালোচকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এটি কি নিছক কাকতালীয় নাকি পাঠকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে লেখকেরা একই ধাঁচের গল্প বারবার লিখছেন।
সানডে টাইমস-এ প্রকাশিত ওই তালিকায় ছিল ড্যান ব্রাউনের 'দ্য সিক্রেট অব সিক্রেটস', ফ্রিডা ম্যাকফ্যাডেনের 'দ্য ডিভোর্স', ফ্লরেন্স ন্যাপের 'দ্য নেমস', ক্লেয়ার ডগলাসের 'দ্য ফ্যামিলি ফ্রেন্ড', জন গ্রিশামের 'দ্য উইডো', রিচার্ড ওসমানের 'দ্য ইমপসিবল ফরচুন', রবার্ট গ্যালব্রেইথের 'দ্য হলমার্কড ম্যান', অ্যালিস ফিনির 'মাই হাজব্যান্ডস ওয়াইফ' এবং ফিলিপা গ্রেগরির 'বোলিন ট্রেইটর'। ঐতিহাসিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার কিংবা পুলিশি তদন্ত—ধরন ভিন্ন হলেও এই সবকটি গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নারীর মৃত্যু। কেবল 'দ্য করেসপনডেন্ট' নামক উপন্যাসটি এই ধারার বাইরে, যেখানে চিঠি লেখার শিল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নেই।
ব্রিটিশ লেখক ওয়েন্ডি জোনস প্রথম এই বিষয়টি সামনে আনেন। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, “এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের মানুষ যে বইগুলো সবচেয়ে বেশি কিনেছে ও পড়েছে, তার ৯০ শতাংশ বিনোদনের জন্য একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। আসলে কী ঘটছে?”
যুক্তরাজ্যের সাহিত্যে নারী হত্যা একটি পুরনো বিষয়। ড্যাফনি ডু মরিয়েরের গথিক রহস্য থেকে শুরু করে গিলিয়ান ফ্লিনের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে এটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান। বিশেষ করে ২০১২ সালে গিলিয়ান ফ্লিনের 'গন গার্ল' প্রকাশের পর 'গার্ল থ্রিলার' লেখার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং প্রকাশনা সংস্থাগুলো এই ধরনের সফল গল্পের খোঁজ শুরু করে।
সমালোচকদের একাংশের মতে, সাহিত্যে বারবার নারীকে হত্যার শিকার হিসেবে দেখানো সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। তবে গবেষকদের ভিন্ন মত রয়েছে। তাদের মতে, অপরাধভিত্তিক গল্পের প্রধান পাঠকগোষ্ঠীই হলেন নারীরা। বাস্তব জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতাকে মানসিকভাবে মোকাবিলা করার উপায় হিসেবেই অনেকে এসব বই পড়েন।
অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক লরা উইলসন মনে করেন, বর্তমান সময়ে গার্হস্থ্য থ্রিলার বা ডমেস্টিক নোয়ার জনপ্রিয় হওয়ার কারণ বাস্তব জীবনের আশঙ্কা। তাঁর ভাষায়, বাস্তবে নারী হত্যার ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী কোনো অচেনা ব্যক্তি নন; বরং স্বামী, সঙ্গী বা পরিবারের পরিচিত কেউই অনেক সময় হত্যাকারী হন। তিনি আরও বলেন, শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরিপেই দেখা গেছে, অপরাধভিত্তিক উপন্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ও পাঠক নারীরাই।
ঔপন্যাসিক ডেনিস মিনা মনে করেন, নারী হত্যার গল্প জনপ্রিয় হওয়ার অর্থ এই নয় যে পাঠকেরা সহিংসতা উপভোগ করেন; বরং তাঁরা জানতে চান, কী ঘটেছিল এবং অপরাধী শেষ পর্যন্ত শাস্তি পেল কি না। তাঁর মতে, গল্প তখনই এগিয়ে যায়, যখন পাঠক নিহত মানুষটির জন্য সত্যিই উদ্বিগ্ন হন।
যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধবিজ্ঞানী ও 'হোয়াই উই লাভ সিরিয়াল কিলারস' বইয়ের লেখক স্কট বন জানান, অনেক নারী আত্মরক্ষার কৌশল শেখার জন্য 'ট্রু-ক্রাইম' পডকাস্ট ও তথ্যচিত্র দেখেন। অন্যদিকে, লেখক লরি রাডার-ডে মনে করেন, অপরাধভিত্তিক উপন্যাস মানুষের উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, বাস্তব জীবনের মৃত্যুর মতো নয়, অধিকাংশ অপরাধভিত্তিক উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত রহস্যের সমাধান হয় এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তবে লরি রাডার-ডের মতে, অধিকাংশ উপন্যাসে নিহত নারীকে তরুণী, সুন্দরী, রোগা, শ্বেতাঙ্গ, স্বর্ণকেশী বা লাল চুলের হিসেবে একইভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা একধরনের সাহিত্যিক শর্টকাট এবং এর পেছনে বর্ণবাদ ও নারীবিদ্বেষের প্রভাব থাকতে পারে।
সব লেখককে এক কাতারে ফেলা ঠিক নয় বলে মনে করেন ভ্যাল ম্যাকডারমিড। অপরাধভিত্তিক সাহিত্যিক সোফি হান্না মনে করেন, “গল্পে সহিংসতা দেখানো আর সহিংসতাকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়।” তাঁর মতে, বাস্তব পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে আঘাত করবেই, তাই সাহিত্যের কাজ সেই সহিংসতাকে নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা।