এটি দুই মানুষের গল্প। দুজনই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন অনশনের মাধ্যমে। সময়ের ব্যবধান প্রায় ১৫ বছর। কিন্তু এই দুই ঘটনার পার্থক্য দেখলে বোঝা যায়, এ সময়ের মধ্যে ভারতের রাজনীতি, সমাজ আর মানুষের ভাবনা কতটা বদলে গেছে।

প্রথমে আন্না হাজারের কথা বলা যাক। নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি মহারাষ্ট্রে ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখ। কিন্তু তিনি জাতীয় আলোচনায় আসেন ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল। এই দিন তিনি দিল্লিতে অনশন শুরু করেন। সেই অনশন মাত্র ৯৬ ঘণ্টার মধ্যেই (৯ এপ্রিল) শেষ হয়। কারণ, সরকার তাঁর দাবি মেনে জন লোকপাল বিল খসড়া তৈরির জন্য যৌথ কমিটি গঠনে রাজি হয়েছিল।

এরপর ১৬ আগস্ট দিল্লির রামলীলা ময়দানে তাঁর দ্বিতীয় ও দীর্ঘ অনশন শুরু হয়। তা শেষ ১২ দিন পর ২৮ আগস্ট। কারণ, ওই দিন সংসদ তাঁর মূল দাবিগুলোর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে।

আন্নার দাবি ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ ও নির্দিষ্ট। তিনি মূলত একটি স্বাধীন লোকপাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তুলেছিলেন। ভারতে দুর্নীতি এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে অনেকেই মনে করেন, অন্য সবাই এতে জড়িত।

.

এই বিশ্বাসের কারণেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়, যদিও সমস্যার স্থায়ী সমাধান সব সময় হয় না। তখন মনমোহন সিংহের সরকার নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগে চাপে ছিল। ফলে আন্নার আন্দোলন মানুষের মনে সাড়া ফেলেছিল।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার শুরু করলে আন্দোলনের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদি এবং যোগগুরু বাবা রামদেবের মতো পরিচিত মুখও এতে যোগ দিয়েছিলেন। সবাই যেন নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তুলে ধরতে চাইছিলেন।

তবে সেই আন্দোলনের আসল শক্তি তখন সামনে আসেনি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক সে সময় নেপথ্যে সমর্থন জোগাচ্ছিল বলে মনে করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ও বাম ঘরানার নেতারা, যেমন মেধা পাটকর, যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণও আন্নার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এর মাধ্যমে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফল তা প্রমাণ করে।

.
মাত্র ১৫ বছরে ভারতের প্রাণবন্ত, উচ্চকণ্ঠ গণতন্ত্র যেন অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে। এই নীরবতা কি আমরা ভাঙতে প্রস্তুত? সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ফল হয়তো ঠিক করবে, আমাদের গণতন্ত্র আবার কথা বলবে, নাকি এই নীরবতার মধ্যেই আটকে থাকবে। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ এই নীরবতা হয়তো এক গভীর সতর্কবার্তা।
.ভারতে মাঠ দখলের পরীক্ষায় পাস করবে কি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’.

মনমোহন সিংহের সরকারও প্রথমে আন্দোলনের গভীরতা বুঝতে পারেনি। পরে তারা আলোচনার জন্য প্রণব মুখার্জি ও একে অ্যান্টনির পাশাপাশি আরও দুজনকে দায়িত্ব দেয়। তাঁদের একজন হলেন মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভিলাসরাও দেশমুখ এবং আরেকজন হলেন সাবেক আমলা উমেশচন্দ্র সারঙ্গি। এই দুজন আন্নার সঙ্গে আলোচনায় সফল হন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

এবার সোনম ওয়াংচুকের প্রসঙ্গে আসি। তাঁর অনশন আন্নার থেকে অন্তত দুইভাবে আলাদা। প্রথমত, তাঁর দাবি অনেক বেশি বাস্তব ও সরাসরি। আন্নার দাবি ছিল একটি নীতি বা কাঠামো তৈরি করতে হবে। আর ওয়াংচুক সরাসরি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ চাইছেন। এতে দুই আন্দোলনের রাজনৈতিক বোধের পার্থক্য স্পষ্ট হয়।

আন্নার দাবি তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু ওয়াংচুকের দাবি অনেক কঠিন এবং সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত করে।

.

দ্বিতীয়ত, ওয়াংচুকের পাশে বিরোধী শক্তির সমর্থন প্রায় নেই। আন্নার সময় সরকারকে চাপে ফেলতে বিরোধী দল এই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু এখন বিরোধীরা বিভক্ত ও কৌশলহীন। ওয়াংচুকের সাফল্যে কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি লাভ নেই। আন্নার আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরাসরি লাভ হয়েছিল বিজেপির। সে সময় বিরোধী রাজনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে তারাই এই আন্দোলনের ফল ভোগ করে।

এই বাস্তবতা আমাদের বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। সমাজ হিসেবে আমরা কী ভাবছি? আমরা কি এখন শুধু নির্বাচনের ফল দিয়েই সবকিছু বিচার করি? আমরা কি নিজেদের সুবিধামতো নৈতিকতা বেছে নিই?

আন্নার সময় পুরো দেশ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। বিনোদনজগতের ছোট-বড় তারকারাও প্রকাশ্যে মত দিতেন। আজ সেই কণ্ঠস্বর কোথায়?

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও বদলেছে। আন্নার সময় যে প্রবল প্রচার দেখা গিয়েছিল, এখন তা নেই। শিল্প-বাণিজ্যের বহু মানুষ তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন মনে হয়, করপোরেট জগৎ অনেক বেশি নীরব, যেন তারা ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে।

.দম্ভের কারণেই কি ‘ককরোচদের’ বুঝছে না মোদি সরকার?.

মাত্র ১৫ বছরে ভারতের প্রাণবন্ত, উচ্চকণ্ঠ গণতন্ত্র যেন অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে। এই নীরবতা কি আমরা ভাঙতে প্রস্তুত? সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ফল হয়তো ঠিক করবে, আমাদের গণতন্ত্র আবার কথা বলবে, নাকি এই নীরবতার মধ্যেই আটকে থাকবে। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ এই নীরবতা হয়তো এক গভীর সতর্কবার্তা।

গিরীশ কুবের লোকসত্তা পত্রিকার সম্পাদক

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত