সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২২-২৩ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এর মধ্যে ১২-১৩ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান দেশে হলেও বাকি ৮-৯ লাখ তরুণকে বিদেশের শ্রমবাজারে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজতে হয়। সহায়-সম্বল বিক্রি করে কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তারা শুরু করেন ভাগ্যবদলের এক অনিশ্চিত যাত্রা।
নিঃসঙ্গ জীবন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম এবং কর্মক্ষেত্রের নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করে তারা মাস শেষে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা কেবল তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলায় না, বরং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রশ্ন জাগে, জনশক্তি রপ্তানির চার দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিদেশগামী তরুণদের জন্য আমরা কি একটি নিরাপদ, ভোগান্তিহীন ও প্রতারণামুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পেরেছি?
এই প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তরটিই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ইতিহাসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি বাংলাদেশিদের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে এখানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগ চলে আসছে। ১০টি এজেন্সির একটি সিন্ডিকেটের কারণে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এই বাজার বন্ধ হয়ে যায়। চার বছর পর ২০২২ সালে পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও ২০২৪ সালের জুনে ‘মালয়েশিয়া চক্র’ নামক একটি গোষ্ঠীর কারসাজিতে আবারও বন্ধ হয়ে যায় এই শ্রমবাজার। যার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় স্বপ্নবাজ তরুণদের।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ১৪টি দেশের মধ্যে কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন চক্র গড়ে উঠেছিল, যেখানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রভাবশালীরা যুক্ত ছিলেন। শুরুতে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাও জড়িত ছিলেন। সরকার নির্ধারিত ফি ছিল ৭৯ হাজার টাকা, কিন্তু এই চক্র একেকজন কর্মীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত।
বিপুল ঘুষ ও দুর্নীতির জোরে এই সিন্ডিকেট টিকে থাকলেও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা মানবেতর ও অমর্যাদাকর পরিস্থিতির শিকার হন। শ্রমিকদের এই দুর্দশার বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) থেকেও বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বাংলাদেশিদের জন্য খুলে যাচ্ছে, যা তরুণদের জন্য একটি আশার খবর। এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক আওয়ামী লীগ এমপিদের সংশ্লিষ্ট ৪৯টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল লাইসেন্স বাতিলই যথেষ্ট নয়, এই চক্রের সকল সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এমন অপকর্ম করতে সাহস না পায়।
মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী করতে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় যেন কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি পুনরায় চক্র বা সিন্ডিকেট গঠন করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। নিশ্চিত করতে হবে যেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আর কখনোই বন্ধ না হয়।