কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ ধসে পড়ার পর চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ফরজ উদ্দিন (৭০) লক্ষ্য করেন, নদীর প্রবল ঘূর্ণিতে বাঁধের ব্লক পিচিং একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি দ্রুত স্থানীয় সড়কটারী জামে মসজিদে গিয়ে মাইকে ঘোষণা দেন, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন, বাঁধ ভাঙছে।’
এই সতর্কবার্তার আধা ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থানীয় মানুষ নদীপাড়ে জড়ো হয়ে জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙন ঠেকানোর জরুরি কাজ শুরু করেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডও (পাউবো) সেখানে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফরজ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধস শুরু হওয়ার সময় তিনি নদীর পাড়েই ছিলেন। নদীর ঘূর্ণিতে একের পর এক ব্লক নদীতে তলিয়ে যেতে থাকে। তখন ঘটনাস্থলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকে দেখতে পাননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন। মানুষ না এলে তখনই বাঁধের আরও বড় অংশ ভেঙে যেত। সবাই মিলে জিও ব্যাগ ফেলায় আপাতত ভাঙন কিছুটা ঠেকানো গেছে।”
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আশাবাদী নন। তাঁর ভাষ্য, ‘এই বাঁধ ভেঙে গেলে কাঁচকোল, চিলমারীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা হুমকিতে পড়বে। এক মাসে চারবার ধস হয়েছে। হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, মসজিদ, স্কুল ও কয়েক হাজার পরিবার ঝুঁকিতে আছে। ১০-২০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে লাভ হবে না। এই এলাকার মানুষকে বাঁচাতে স্থায়ী টি-বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’
মঙ্গলবার দুপুরে দেখা যায়, পাউবোর তত্ত্বাবধানে শ্রমিকেরা জিও ব্যাগ ফেলছেন এবং একটি কারিগরি দল নদীর গভীরতা ও তলদেশের অবস্থা পরিমাপ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ফেলানী বেওয়া (৭৫) তাঁর আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, ‘বিকেল থেকে হঠাৎ নদীর পানি ফুলে ওঠে। ব্লকগুলো ধপাধপ করে নদীতে পড়ে যায়। বুড়া মানুষ, নদীভাঙন শুরু হলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। এই বয়সে ভিটেমাটি হারালে কোথায় যাব। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, আমাদের নদীভাঙন থেকে বাঁচান।’
ভাঙন প্রতিরোধকাজে নিয়োজিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সর্দার মজিবুর রহমান জানান, ১ জুলাই প্রথম ধসের পর চার দফায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে কালিরকূড়া থেকে কাঁচকোল টি-বাঁধ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১০টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে ফেলা জিও ব্যাগের কার্যকারিতা বোঝা যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, একসঙ্গে অন্তত এক লাখ জিও ব্যাগ এবং তিনটি টি-বাঁধ নির্মাণ করা হলে নদীর স্রোত তীর থেকে সরে যাবে এবং ভাঙন কমবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার একই বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ধসে যায়। চলতি জুলাই মাসেই বাঁধটির চারটি স্থানে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও আবাদি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। পাউবো সূত্রমতে, ২০১৬ সালে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বাঁধটি ২০১৮ সাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে ধসে পড়তে শুরু করে। একাধিকবার জরুরি সংস্কার করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে নতুন চর জেগে ওঠায় মূল স্রোত এখন পশ্চিম তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় চলতি মাসে চারটি স্থানে ধস দেখা দিয়েছে। এসব স্থানে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ইতিমধ্যে ডাম্পিং করা হয়েছে। কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে রাকিবুল হাসান বলেন, পুরো বাঁধ পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেটি অনুমোদন পায়নি। নতুন করে প্রকল্প পাঠানো হবে। অনুমোদন মিললে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিয়ে স্থায়ী সমাধানের কাজ শুরু করা হবে।