কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের আমলাপাড়া এলাকায় বসতবাড়িতে ইয়াবা ও হেরোইনের ‘খুচরা দোকান’ চালানোর অভিযোগে হাসি (৩৫) নামের এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে হাসির স্বামী সিজন মিয়া এবং তাঁদের এক আত্মীয় আশিক মিয়া রয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় এবং ভৈরব বিএনপির এক নেতার হস্তক্ষেপে এই অভিযান চালানো হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযান চলাকালে ওই বাড়ি থেকে ১০০ পুরিয়া হেরোইন, ১১০টি ইয়াবা এবং ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। ভৈরব থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লিমন বোস বলেন, "হাসি ভৈরবের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের একজন। তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আগে থেকেই একাধিক মামলা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাসি ও তাঁর স্বামী নিজেদের ঘরটিকেই মাদকের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। প্রতিদিন ভোর থেকে সেখানে মাদক কেনাবেচা এবং সেবনের কাজ চলত, যা নিয়ে আমলাপাড়া এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অতিষ্ঠ ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা হান্নান আহম্মেদ বলেন, "হাসি বাড়িতে হেরোইন ও ইয়াবা বিক্রির দোকান খুলে বসেছেন। প্রতিদিন ভোর থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাঁর কাছে অসংখ্য ক্রেতা আসেন। এর প্রভাব পড়ছে পুরো জনপদের আইনশৃঙ্খলায়। চুরি, ছিনতাই ও নানা অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছে।"

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভৈরব উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম জানান, তিনি ওই এলাকায় সড়ক নির্মাণকাজ দেখতে গিয়েছিলেন। তখন স্থানীয় নারীরা মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে তাঁর কাছে সহযোগিতা চান এবং হাসির নাম উল্লেখ করেন। এরপর তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে হাসির বাড়িতে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি জানালা দিয়ে মাদক ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে তিনজনকে আটক করে। আরিফুল ইসলাম বলেন, "তাঁরা মূলত সড়ক নির্মাণকাজ দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নারীরা মাদক থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য চাইলে তাঁরা বিষয়টি গুরুত্ব দেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে অভিযানে গেলে হাসি জানালা দিয়ে মাদক ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ এসে হাসিসহ তিনজনকে আটক করে নিয়ে যায়।"

গ্রেপ্তারের পর হাসি দাবি করেন, ভৈরবে মাদকের জন্য শুধু তাঁকেই দায়ী করা হচ্ছে। উত্তেজিত স্বরে তিনি বলেন, "ভৈরবের ঘরে ঘরে মাদক খায় আর বিক্রি করে, দোষ হয় শুধু আমার। পুকুরপাড় ও আমলাপাড়া এলাকায় অভিযান চালালে খুব কম বাড়িই পাওয়া যাবে, যেখানে মাদক বা মাদকসেবীর অস্তিত্ব নেই।"

আটক অবস্থায় হাসি আরও জানান, উদ্ধারকৃত টাকার মধ্যে ১২ হাজার ৬৪০ টাকা মাত্র এক ঘণ্টায় মাদক বিক্রি করে পাওয়া। তিনি অভিযোগ করেন, লাভের বড় অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু রাজনৈতিক নেতাদের দিতে হয়। একই কথা বলেন তাঁর স্বামী সিজন মিয়া। শারীরিক সমস্যার কারণে পরিশ্রমের কাজ করতে না পারায় তিনি স্ত্রীর এই কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি বলেন, "মাসিক মাসোহারা দিয়ে এবং বিভিন্ন ঝুঁকি সামলে এই ব্যবসা চালাতে হয়। পুলিশের মামলা, গ্রেপ্তার ও আইনি ব্যয়ের কারণে লাভের বড় অংশ চলে যায়।"

স্থানীয়দের মতে, সড়ক, রেল ও নৌপথের সহজলভ্যতার কারণে ভৈরব মাদক পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পৌর শহরের পঞ্চবটি পুকুরপাড় ও আমলাপাড়া এলাকাকে মাদকের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়।