করপোরেট সংস্কৃতির এই যুগে মানুষের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসের নাম বোধ হয় ‘মি-টাইম’। সপ্তাহের পাঁচ দিন খাটুনি শেষে আমরা চেয়ে থাকি উইকএন্ডের দিকে।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করার মতো, প্রচুর ছুটি আর অবসর কাটানোর অজস্র উপায় থাকা সত্ত্বেও মানুষের ভেতরের ক্লান্তি আর ‘বার্নআউট’ কমছে না।
ছুটির দিনেও একটা অদৃশ্য উদ্বেগ পিছু ছাড়ে না। আমরা ‘অবসর’ বলতে যা বুঝি, তার বাহ্যিক চাকচিক্য আর ভেতরের বাস্তবতার মধ্যে একটা বিরাট ফারাক থেকে যায়।
ইসলাম এই সময় আর অবসরের ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে, অবসর এখানে কোনো বাহ্যিক পরিবেশের নাম নয়, বরং মনের একটা অবস্থা।
দুই নেয়ামত: মানুষ যেখানে ধোঁকায় পড়ে
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এমন দুটি নেয়ামত আছে, যার ব্যাপারে বহু মানুষ ধোঁকায় থাকে—সুস্বাস্থ্য আর অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
এই হাদিসে একটি পরিচিত মানসিক প্যাটার্ন ধরা পড়ে। মানুষ যখন সুস্থ থাকে আর হাতে সময় থাকে, তখন মনে করে এই অবস্থা চিরকাল থাকবে, তাই আলসেমিতে সেই সময় নষ্ট করে ফেলে।
কিন্তু হুট করে ব্যস্ততা বা অসুস্থতা এলে তখন আফসোস শুরু হয়। এই ক্ষতি এড়াতেই নবীজি (সা.) জীবনের পাঁচটি অবস্থাকে অন্য পাঁচটি আসার আগে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন, যার একটা হলো ব্যস্ততা আসার আগে অবসরকে পুরোপুরি ব্যবহার করা। (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, ১০/২১৫, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৩)
আরবিতে এই অবসরের জন্য শব্দ হলো ‘ফারাগ’; যার শাব্দিক অর্থ কোনো স্থান খালি করা বা ঢেলে মুক্ত করা। (ইবনে মানজুর, লিসানুল আরব, ৮/৪৫০, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৩)
অর্থাৎ ইসলামে অবসর মানে অলস বসে থাকা নয়, মনকে পার্থিব কোলাহল থেকে খালি করে অন্য একটা উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করা।
.সফল জীবনের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা: নবীজির ১০ সূত্র .অবসর একটি মানসিক অবস্থা
আমরা প্রায়ই ভাবি, অবসর মানে কাজের চাপ না থাকা, ছুটিতে থাকা বা কোনো মনোরম জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু এটা একটা আংশিক ধারণামাত্র।
বাস্তবে দেখা যায়, অনেকে বছরের পর বছর ছুটি না পেয়ে প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তবু তাদের মন থাকে শান্ত।
আবার কেউ পাঁচতারা রিসোর্টে ছুটি কাটাতে গিয়েও অফিসের ই–মেইল আর ভবিষ্যৎ উদ্বেগে ভোগেন। পার্থক্যটা বাহ্যিক সময়ে নয়, ভেতরের মনের অবস্থায়।
ইবনুল জাওজি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মানুষের অন্তরের প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন সে হৃদয়কে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে মুক্ত করতে পারে, নইলে বাহ্যিক মুক্তি প্রকৃত শান্তি দেয় না। (ইবনুল জাওজি, সাইদুল খাতির, ১/১৫৫, দারুল কলম, দামেস্ক, ২০০২)
কাজের চাপ অবসরের প্রধান বাধা নয়, অন্তরের ভেতরের বিশৃঙ্খলাই আসল বন্দিত্ব।
অনুভূতি বদলে দেয় বিশ্বাস
একজন মুমিনের সময়ের অনুভূতি আর একজন অবিশ্বাসীর সময়ের অনুভূতির মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। মুমিন যখন আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তখন সে জানে তার রিজিক-জীবন-মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস তাকে বাহ্যিক ব্যস্ততার মধ্যেও একধরনের ভেতরের প্রশান্তি দেয়।
বিপরীতে, যে শুধু বস্তুগত জগতে বিশ্বাসী, সে সব সময় এক তাড়ায় থাকে, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, অথচ অনেক কিছু পাওয়ার বাকি—এই অতৃপ্তি তাকে হতাশায় নিমজ্জিত করে।
সুরা আসরে আল্লাহ সময়ের শপথ করে এই লোকসানের কথা বলেছেন, ‘সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ চরম লোকসানের মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া, যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, আর একে অপরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর: ১-৩)
আর যে আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কোরআন বলছে, তার জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশ্চয়ই তার জীবন হবে সংকীর্ণ ও কষ্টদায়ক।’ (সুরা তা-হা, আয়াত: ১২৪)
.ভুলে যাবেন না, শরীরচর্চা একটি সুন্নত.বুকের প্রসারণ, বুকের সংকোচন
কোরআনে এই মানসিক অবস্থা বোঝাতে দুটো প্রতিশব্দ আছে, ‘শারহ’ (বুকের প্রসারণ) আর ‘যিক’ (বুকের সংকীর্ণতা)। ‘সুতরাং আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিতে চান, তার বুককে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার বুককে এমন সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে আকাশে আরোহণ করছে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২৫)
নবীজির জীবনে ‘শাক্কে সদর’ বা হৃদয় বিদীর্ণ করে ধৌত করার ঘটনা দুইবার ঘটেছিল—একবার শৈশবে, আরেকবার মিরাজের প্রাক্কালে।
ফেরেশতারা জমজম পানি দিয়ে তাঁর হৃদয় ধুয়ে ইমান ও হেকমত দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/২০৪, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৯৮৬)
এই ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁর হৃদয়কে পার্থিব কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ খালি করা, যেন তিনি ওহির ভার বহন করতে পারেন।
সুরা ইনশিরাহ: অবসরের একটা নির্দেশনা
সুরা ইনশিরাহে আল্লাহ সান্ত্বনা দিয়ে নবীজিকে বলেন, তিনি তাঁর বুক প্রসারিত করেছেন, তাঁর ভার লাঘব করেছেন। এরপর আসে সেই বিখ্যাত ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)
এরপরই আসে অবসর নিয়ে সেই মূল নির্দেশনা, ‘যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই ইবাদতে নিয়োজিত হও। আর তোমার প্রতিপালকের দিকেই পূর্ণ মনোযোগী হও।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, একজন মুসলিমের জীবনে ‘অলস বসে থাকার’ মতো কোনো অবসর নেই। দৈনন্দিন কাজ শেষ হওয়া মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরেকটা কাজ, আল্লাহর দরবারে একান্তে দাঁড়ানো।
গাজালি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে এই রূপান্তর ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, একজন মুমিনের জন্য প্রকৃত অবসর হলো রুটিন কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আরও গভীর একটা আত্মিক শ্রমে লিপ্ত হওয়া, যা ক্লান্ত করার বদলে আত্মাকে নতুন শক্তি দেয়। (গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৪/২০, দারুল খাইর, বৈরুত, ১৯৯৮)
আমরা সবাই একটা বিশাল অবসর সময় নিয়ে পৃথিবীতে আসি, কিন্তু ধীরে ধীরে মন ও আত্মাকে ব্যস্ততা আর লোভের শৃঙ্খলে বন্দী করে ফেলি।
তখন আমরা বাহ্যিক ছুটির পেছনে ছুটি, কিন্তু ভেতরের বন্দিত্ব ঘোচে না। ইসলাম যে স্বাধীনতার কথা বলে, তাতে শরীর ঘাম ঝরালেও মন থাকবে মুক্ত, আল্লাহর স্মরণে সজীব।
প্রতিদিনের যান্ত্রিকতা থেকে কয়েকটা মুহূর্তের জন্য হলেও হৃদয়ের সিংহাসনটা তার আসল মালিকের জন্য খালি রাখা—এটাই সেই অবসর, যা কোনো রিসোর্ট বা ছুটি দিতে পারে না।
.অবসর সময় মুমিনের জীবনে নিয়ামত