কায়েনাত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কেবল তথ্য-সংগ্রহ, পরিমাপ কিংবা বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে না। প্রকৃতি এমন এক বাস্তবতা, যার একটি অংশ পরিমাপযোগ্য, আরেকটি অংশ অভিজ্ঞতালব্ধ; একটি অংশ বিশ্লেষণাত্মক, আরেকটি অংশ সম্পর্কমূলক; একটি অংশ দৃশ্যমান বিন্যাসে প্রকাশিত, আরেকটি অংশ তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে নিহিত।

ফলে প্রকৃতিকে জানা মানে নিছক অভিজ্ঞতা হাসিল ও তথ্য জানা নয়। এটি জ্ঞানের প্রকৃতি, সীমা ও পদ্ধতি সম্পর্কে একটি মৌলিক দার্শনিক অনুসন্ধান।

আধুনিক জ্ঞানব্যবস্থা প্রকৃতিকে জানার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ দূরত্বকে জ্ঞানের জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। জ্ঞান অর্জনের জন্য পর্যবেক্ষককে পর্যবেক্ষণের বিষয় থেকে আলাদা থাকতে হবে, এই ধারণা আধুনিক বৈজ্ঞানিক তরিকার কেন্দ্রে অবস্থান করে।

এখানে প্রকৃতি এক ‘অবজেক্ট অব ইনকুয়ারি’; আর মানুষ ‘সাবজেক্ট অব নলেজ’ । এখানে জ্ঞান উৎপাদনের জন্য বিষয়কে বিশ্লেষণযোগ্য এককে ভাঙা হয়, তার উপাদানসমূহ পরিমাপ করা হয়, তার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়, আর সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো নির্মিত হয়।

.
একটি নদীকে সত্যিকার অর্থে জানা মানে তার সভ্যতাগত স্মৃতিকে জানা। নদীর তীরে গড়ে ওঠা মানবজীবনের ইতিহাসকে উপলব্ধি করা; তার মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক অভিযোজনকে বুঝতে পারা।
.

এই পদ্ধতি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কার্যকর। এর মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির বহু গোপন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জেনেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের গতিবিদ্যা বুঝেছে, জীববৈচিত্র্যের সংকট নির্ণয় করেছে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করেছে। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই অর্জনকে এনকার করে না। সে কবুল করে যে প্রকৃতিকে জানার একটি অপরিহার্য পথ হলো পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও বিশ্লেষণ।

কিন্তু এই পদ্ধতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে প্রকৃতির কার্যপ্রণালি সম্পর্কে জ্ঞান দেয়, কিন্তু তার অস্তিত্বগত অর্থ সম্পর্কে নয়। সে কাঠামোকে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু তাৎপর্যকে উন্মোচন করে না। সে সম্পর্কের গাণিতিক রূপটি প্রকাশ করে, কিন্তু সেই সম্পর্কের জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে ধারণ করতে পারে না।

এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা তার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান নির্মাণ করে।

সে বলে, প্রকৃতিকে জানার দুটি পরস্পর সম্পূরক পথ রয়েছে।

.তাওহিদি জ্ঞানতত্ত্ব ও ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা: বাস্তবতা, সত্য ও জ্ঞানের সমন্বয়.

প্রথম পথ হলো পর্যবেক্ষণমূলক জ্ঞান, যা ইন্দ্রিয়, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে গঠিত। এখানে প্রকৃতি গবেষণার বিষয়। মানুষ পরিমাপ করে, তুলনা করে, শ্রেণিবিন্যাস করে, কারণ-কার্য সম্পর্ক শনাক্ত করে। এই জ্ঞান প্রকৃতির বাহ্যিক গঠন, কার্যগত নিয়মাবলি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য।

দ্বিতীয় পথ হলো অংশগ্রহণমূলক উপলব্ধি, যেখানে মানুষ প্রকৃতিকে কেবল পর্যবেক্ষণ করে না; তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এখানে প্রকৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তুরূপে উপস্থিত হয় না, বরং এক পারস্পরিক সহাবস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এই উপলব্ধি গঠিত হয় শ্রদ্ধা, মনোযোগ, সহানুভূতি, নৈতিক সংবেদনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে।

এখানে জানার অর্থ ঘটনার তথ্যগত বিবরণ হাসিলে সীমিত নয়। বরং জানা মানে ঘটনার অন্তর্নিহিত অবস্থান, তার সম্পর্কময়তা এবং তার অর্থের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া।

ধরা যাক, একটি নদী। তাকে জানার মানে কী? আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদীর গভীরতা, প্রবাহের হার, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা, পলির ঘনত্ব, দূষণের উপাদান ইত্যাদি নির্ণয় করা। এই জ্ঞান অপরিহার্য। কারণ, এটি নদীর ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়।

কিন্তু নদী সম্পর্কে জ্ঞান কি এখানেই সমাপ্ত? ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা বলে, না।

.
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই কারণে আধুনিক জ্ঞানের বস্তুকরণের প্রবণতার সমালোচনা করে। কারণ, যাকে আমরা কেবল বস্তু হিসেবে জানি, তার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা জন্মায় না।
.

একটি নদীকে সত্যিকার অর্থে জানা মানে তার সভ্যতাগত স্মৃতিকে জানা। নদীর তীরে গড়ে ওঠা মানবজীবনের ইতিহাসকে উপলব্ধি করা; তার মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক অভিযোজনকে বুঝতে পারা এবং তার নীরব প্রবাহে নিহিত এক সমন্বিত ধারাবাহিকতাকে অনুভব করা।

নদী কেবল জলরাশির গতি নয়; সে সময়, ভূগোল, সমাজ, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের একটি সংলগ্ন বয়ান।

এই দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের ধারণাকে মৌলিকভাবে প্রসারিত করে। এখানে জ্ঞান আর কেবল তথ্যের হাজিরি নয়; বরং সে সামগ্রিক সম্পর্ক। অর্থাৎ জ্ঞান হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে জানার বিষয়কে বাইরে থেকে অধিকার করা হয় না, বরং তার সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়, যা তার স্বকীয়তাকে অক্ষুণ্ন রেখে তার অর্থকে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই কারণে আধুনিক জ্ঞানের বস্তুকরণের প্রবণতার সমালোচনা করে। কারণ, যাকে আমরা কেবল বস্তু হিসেবে জানি, তার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা জন্মায় না। ফিতরাতি জ্ঞানতত্ত্ব তাই জোর দেয় সম্পর্কমূলক জ্ঞানের ওপর।

.ফিতরাত: অস্তিত্ব, উদ্দেশ্য ও নেজামের দার্শনিক ভিত্তি.

এখানে জ্ঞানের মৌলিক শর্ত হলো মনোযোগী উপস্থিতি। প্রকৃতিকে জানা মানে তাকে শোনা, তার পরিবর্তন লক্ষ্য করা, তার প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করা এবং তার সঙ্গে মানবিক-নৈতিক সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করা।

এই জ্ঞানতত্ত্বে তিনটি তবকা কাজ করে—

প্রথমত, তথ্যগত জ্ঞান, যা প্রকৃতির পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাখ্যামূলক জ্ঞান, যা সেই তথ্যের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ সম্পর্ক ও প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে।

তৃতীয়ত, প্রজ্ঞামূলক জ্ঞান, যা সেই বাস্তবতার নৈতিক ও অস্তিত্বগত তাৎপর্য উপলব্ধি করায়।

এই তৃতীয় তবকাটি ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার স্বাতন্ত্র্য। যার দাবি হলো, মানুষকে এমনভাবে দেখা, জীবিত ও সক্রিয় রাখা, যাতে সে সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

.
প্রকৃতিকে জানার অর্থ তাকে কেবল মাপা নয়; তাকে পাঠও করা। কেবল ব্যাখ্যা করা নয়; তাকে শোনাও। কেবল নিয়ন্ত্রণ করা নয়; তার সঙ্গে সংলাপেও প্রবেশ করা।
.

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে ফারাসাত বা অন্তর্দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা কোনো অস্পষ্ট আবেগপ্রবণতা বোঝানো হয় না। বরং এটি এমন এক শাণিত উপলব্ধিশক্তি, যা গড়ে উঠে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, নৈতিক সংবেদনশীলতা এবং অভিজ্ঞতালব্ধ মনোযোগের অসিলায়।

এই যে একজন কৃষক আকাশের রং দেখে বৃষ্টির সম্ভাবনা বোঝেন, একজন মাঝি বাতাসের গতি অনুভব করে নদীর মেজাজ অনুধাবন করেন, এ কেবল লোকজ অভ্যাস নয়, এগুলো অংশগ্রহণমূলক জ্ঞানের উদাহরণ।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই ধরনের জ্ঞানকে প্রাক্‌-বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার হিসেবে বাতিল করে না। এগুলোকে সে সম্পর্কগত আকেলমন্দি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এখানে জ্ঞান উৎপাদনের আদর্শ রূপ হলো সমন্বয়।

বিজ্ঞান প্রকৃতির গঠন ব্যাখ্যা করবে; অংশগ্রহণমূলক উপলব্ধি এই গঠনের তাৎপর্য উন্মোচন করবে।

একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।

শুধু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রকৃতিকে যান্ত্রিক করে তোলে। শুধু অনুভব প্রকৃতিকে অনির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষণ ও অংশগ্রহণের সমন্বয় প্রকৃতির এমন একটি সম্যক বোধ নির্মাণ করে, যা একই সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ, নৈতিক ও সম্পর্কনিষ্ঠ।

অতএব প্রকৃতিকে জানার অর্থ তাকে কেবল মাপা নয়; তাকে পাঠও করা। কেবল ব্যাখ্যা করা নয়; তাকে শোনাও। কেবল নিয়ন্ত্রণ করা নয়; তার সঙ্গে সংলাপেও প্রবেশ করা।

কারণ, প্রকৃতি কোনো নির্বাক বস্তু নয়, যার ওপর জ্ঞান প্রয়োগ করা হয়। প্রকৃতি এমন এক অর্থবাহী বাস্তবতা, যার সঙ্গে সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন সম্ভব।

এই সম্পর্কনিষ্ঠ জ্ঞানই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বীয় বনিয়াদ।

  • মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

.ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার অস্তিত্বতত্ত্ব: ওজুদ, মিজান ও তাওহিদের স্থাপত্য