সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা থেকে মিরাজ শেখ (৩০) নামের এক ব্যক্তিকে গুম করার অভিযোগ উঠেছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এই ঘটনার অবিলম্বে তদন্ত করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, মিরাজ শেখকে সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে গত দুই বছরের মধ্যে এটি বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা হতে পারে।
লন্ডনের স্থানীয় সময় রোববার রাতে এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গুমের ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ শাসন করা অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করে। ওই অধ্যাদেশের মাধ্যমে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আদালতের আদেশ ছাড়াই যেকোনো বন্দিশালা পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ওই অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছে এবং এর পরিবর্তে নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত এই আইনে মানবাধিকার কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সর্বশেষ এ ঘটনা দেখাচ্ছে যে যথাযথ সংস্কার ছাড়া এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এ ধরনের চর্চা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের (নাগরিকদের) সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।’
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ড সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। পরদিন তাঁর পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাঁদের বলা হয়, মিরাজ একটি ‘অভিযানে’ আছেন এবং বিকেলে আসতে বলা হয়। কিন্তু বিকেলে গেলে কোস্টগার্ড জানায়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।
যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ এবং যেখানে তাঁর মোটরসাইকেলটি ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই দোকানের মালিক জানান, ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলের তালা খুলে সেটি নিয়ে যান এবং পরদিন তা ফেরত দিয়ে যান।
মিরাজ শেখের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা গুম করার সময় ও পরিস্থিতি এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরা কীভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।’
মিরাজের পরিবার এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের চিঠি দিলেও কোনো ফল পায়নি। পরবর্তীতে মিরাজের বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১২ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ওই জেলেকে খুঁজে বের করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে কোস্টগার্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন মিরাজ শেখকে আটকের কথা অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তাঁর বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
আইনি সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল, যার মাধ্যমে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু নবনির্বাচিত সরকার অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ করে এমন আইনের প্রস্তাব করেছে, যেখানে পুলিশই গুমের তদন্ত চালাবে এবং মানবাধিকার কমিশনের কাজ হবে কেবল ‘সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছে তদন্তের প্রতিবেদন চাওয়া’। এতে কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধি-বিধান প্রণয়নে সরকারের প্রভাব বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং কমিশনকে গুমের ঘটনা তদন্তের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনার তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হবে না।’