সুনামগঞ্জে গত দুদিন ধরে চলা ভারী বৃষ্টি এবং উজানের পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রধান নদী সুরমার পানি ছাতক উপজেলায় বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি দিরাই উপজেলার মারকুলি এলাকায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করছে।
নদী ও হাওরে পানি বাড়ায় জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের মতে, ভারী বৃষ্টির সঙ্গে উজানের পাহাড়ি ঢল নামার কারণে পরিস্থিতির এই অবনতি। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ এবং ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় ঢলের পানি নামছে এবং নদ-নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর এলাকায় পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ৫৩ মিটারে। সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে ২২ সেন্টিমিটার। গত রোববার সকাল ৯টা থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১১০ মিলিমিটার। উল্লেখ্য, এই মৌসুমে ৭ জুলাই জেলায় সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
ছাতক উপজেলা শহরের কাছে সুরমা নদীর বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৭০ মিটার হলেও বেলা ৩টায় পানির উচ্চতা ছিল ৮ দশমিক ৯০ মিটার। অন্যদিকে, দিরাই উপজেলার মারকুলি এলাকায় কুশিয়ারা নদীর বিপৎসীমা ৭ দশমিক ৫ মিটার হলেও বর্তমানে পানির উচ্চতা ৭ দশমিক ৮ মিটার। এছাড়া তাহিরপুরের যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুরের নলজুর ও কুশিয়ারা এবং দোয়ারাবাজারের চেলা ও খাসিয়ামারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া, চারাগাঁও ও চানপুর এলাকায় মেঘালয় পাহাড় থেকে ব্যাপক ঢল নেমেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, "গতকাল রাতে ব্যাপক পরিমাণে পাহাড়ি ঢল নামে। এতে এলাকার কিছু বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে। ঢলের পানি নামলেই এই সমস্যা হয়।"
দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা আবদুল মোতালেব জানান, তাদের উপজেলার খাসিয়ামারা, মৌলা ও চেলাই নদীতে ঢল নামায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিচু এলাকার রাস্তাঘাটে পানি থাকায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে।
তবে বর্তমানে বড় ধরনের বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি হবে। এতে পানি আরও বাড়বে। কোনো এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে।"
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত নৌযান, স্বেচ্ছাসেবক ও ১ হাজার ৫৬টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত আছে।"
জেলা প্রশাসক আরও জানান, জেলার ১২টি উপজেলায় ১ হাজার ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও জিআর চাল পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে টানা এক সপ্তাহের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সে সময় জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয় এবং হাওরে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়। এক সপ্তাহ বৃষ্টি কম থাকার পর আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে।