একসময় পাহাড়ি ফল হিসেবে পরিচিত মাল্টা এখন সমতল ভূমিতেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। উত্তরের জেলা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার মিরজাগঞ্জ এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরহাদুজ্জামান ফাহিম সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তিন একর জমিতে গড়ে তোলা তার বাণিজ্যিক মাল্টা বাগানে রয়েছে এক হাজারের বেশি গাছ।

মৌসুমজুড়ে গাছে গাছে ঝুলতে থাকে থোকা থোকা মাল্টা। এই বাগান থেকেই তিনি বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেন। তার এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার অনেক বেকার যুবকও এখন বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন।

বর্তমানে দেশে মাল্টা একটি জনপ্রিয় ও সহজলভ্য ফল। প্রায় সারা বছরই বাজারে এই ফল পাওয়া যায়। দামের দিক থেকেও এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। বিভিন্ন ভিটামিন ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় মাল্টার চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। সমতল ভূমিতেও যে সফলভাবে মাল্টা চাষ সম্ভব—তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফাহিম।

ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল ফাহিমের। এসএসসি পরীক্ষার আগেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এসএসসি পাসের পর নিজ উদ্যোগে পারিবারিক পুকুরে মাছ চাষ শুরু করে সফলতা পান তিনি। পাশাপাশি মনোযোগ দেন কৃষিকাজে। তবে জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজ করলেও পড়ালেখা থামিয়ে দেননি। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে অধ্যয়নরত।

ফাহিম জানান, তিন একর জমিতে তিনি মাল্টা চাষ শুরু করেন। উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় সিলেট থেকে ‘বারি-১’ জাতের প্রায় ১ হাজার ২০০টি চারা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি চারার দাম ছিল ২৬৫ টাকা। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জমিতে চারা রোপণ করেন।

তিনি বলেন, ভালো ফলনের জন্য প্রথম বছর কোনো গাছেই ফল রাখা হয়নি; কেবল পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গাছে ফল রাখা হয়েছিল। সেই ফল দেখে তার মনে হয়, প্রকৃত মাল্টার রং ও গুণগত মান আরও উন্নত করা সম্ভব। এরপর কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিতে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যান। সেখান থেকে ছয় প্রজাতির চায়না কমলার চারা এনে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন। সেই গাছগুলোতেও ভালো ফলন এসেছে।

উদ্যোক্তা ফরহাদুজ্জামান ফাহিম বলেন, আমি আমার এক স্যারের বাগান দেখি। পাশাপাশি বিভিন্ন বাগানে গিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছি, ইউটিউবে ঘাটাঘাটি করেছি এবং কৃষি অফিসেরও সহযোগিতা নিয়েছি। শুরু করার আগে আমার একটাই চিন্তা ছিল—আমাকে সবার চেয়ে আলাদা কিছু করতে হবে। এরপর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে সিদ্ধান্ত নিই, নিজের জেলার পাশাপাশি দেশের মানুষকে নিরাপদ ফল উপহার দেব। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, আমার মায়ের নামে ‘ফরিদা এগ্রো’ নামে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের পরিকল্পনা করছি, যার একমাত্র লক্ষ্য হবে নিরাপদ ফল উৎপাদন। ভারত থেকে ছয় জাতের কমলার চারা এনেছি পরীক্ষামূলক চাষের জন্য। ভালো ফলাফল পেলে ইনশাআল্লাহ বাণিজ্যিকভাবে চারা এনে চাষাবাদ শুরু করব।

বাগানের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা মহির উদ্দিন বলেন, আমরা সব সময় বাগানে থাকি এবং গাছের পরিচর্যা করি। কোনো গাছে সমস্যা দেখা দিলে ফাহিম যদি কলেজে থাকে, তাকে ফোনে জানাই। মুখে বুঝতে না পারলে ছবি তুলে পাঠাই। এরপর সে ফোনেই বলে দেয় কী করতে হবে বা কী ওষুধ দিতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল ইসলাম বলেন, ফাহিম যখন শুরু করে, তখন আমরা ভেবেছিলাম লেবুর বাগান করবে। পরে জানতে পারি মাল্টা চাষ করবে। তখন মনে হয়েছিল, এত ছোট একটা ছেলে এটা কীভাবে করবে! কারণ আমাদের এলাকায় তো আগে এমন চাষ হতো না। কিন্তু এখন বাগান দেখে আমরা সত্যি অবাক। এই এলাকায় এত সুন্দর মাল্টা চাষ হবে, তা কখনো ভাবিনি।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আপন ইসলাম বলেন, মাল্টা বাগান খুব ভালো হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, ফাহিম কোনো ধরনের রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করে না। বিভিন্ন গাছের ছাল থেকে রস তৈরি করে নিজেই ওষুধ বানিয়ে ব্যবহার করে। বিষয়টি আমাদের খুব ভালো লাগে।

ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সব সময় সকল উদ্যোক্তার পাশে থাকি এবং অনেক কৃষককে উদ্বুদ্ধ করে উদ্যোক্তা বানিয়েছি। কেউ নিজ উদ্যোগে এলেও আমরা সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দিই এবং দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি। আমাদের কোনো প্রকল্পের সুবিধা এলে প্রথমেই উদ্যোক্তাদের বিষয়টি জানানো হয়।

একসময় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সংগ্রাম শুরু করা এক তরুণ আজ সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তার বাগানে উৎপাদিত নিরাপদ মাল্টা যেমন বাজারে চাহিদা তৈরি করেছে, তেমনি তাঁর এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।