ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে এক একান্ত বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম। গত ১৫ জুলাই ভারতের দিল্লিতে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
দিল্লিতে ১৬ জুলাই বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের পঞ্চম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ওই সম্মেলনে যোগ দিতে আগের দিনই ভারত সফরে যান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শামসুল ইসলাম এবং ওই দিন বিকেলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কার্যালয়ে অজিত দোভালের সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি হয়।
বৈঠকটির বিষয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, "সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং গত মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।"
ভারতের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম এই বৈঠকের কথা নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিস্তারিত বিষয় প্রকাশ করেনি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, "প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের পর এটিই দিল্লির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। সীমান্তে ‘পুশ ইন’ নিয়ে টানাপোড়েন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অস্বস্তির প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।"
বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় হয়ে থাকতে পারে। সূত্রমতে, শামসুল ইসলাম ও দোভালের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিমসটেক সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ দমন, আন্তর্দেশীয় সংগঠিত অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা, মানব পাচার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সম্মেলনের আগের দিন অজিত দোভাল বাংলাদেশের প্রতিনিধির পাশাপাশি থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ারম্যান চাতছাই বাংচুয়াদ, শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষাসচিব এয়ার ভাইস মার্শাল সামপাথ থুয়াকুনথা এবং মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যাডমিরাল ইউ তিন অং সানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। তবে থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রতিনিধি পর্যায়ে বৈঠক হলেও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এবং মিয়ানমারের প্রতিনিধির সঙ্গে তিনি একান্তে আলোচনা করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউআইওএন-এর প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার বিষয় উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
"বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করলেন।"
এর আগে গত এপ্রিলে দিল্লি সফরের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারও আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সম্মেলনের আগে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে অজিত দোভালের বৈঠক হয়েছিল। ফলে গত আট মাসে বাংলাদেশের তিনজন শীর্ষ প্রতিনিধি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, "গত আট মাসে বাংলাদেশের তিনজন শীর্ষ প্রতিনিধির সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ধারাবাহিক বৈঠক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত যোগাযোগের চ্যানেল দুই দেশ সচল রাখতে আগ্রহী।"
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন এবং তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা হয়। তবে পরবর্তীতে সীমান্তে পুশ ইন ইস্যু, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং কিছু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক চীন সফর ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের এই কৌশলগত যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।