দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যখন মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটের মতো নানা চ্যালেঞ্জ চলছে, তখন একটি খাত নীরবে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। আর তা হলো আইসক্রিমশিল্প। গত পাঁচ বছরে (২০২১-২০২৬) দেশের আইসক্রিমের বাজার শুধু আকারেই দ্বিগুণ হয়নি; বরং বিনিয়োগ, স্বাদের বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সাধারণ আইসক্রিম থেকে প্রিমিয়াম ফিউশনে উত্তরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে আইসক্রিম এখন আর নিছক শৌখিন খাবার নয়, বরং ভোক্তার স্বাদের প্রতিযোগিতায় হাজার কোটি টাকার এক শক্তিশালী করপোরেট লড়াইয়ের ক্ষেত্র।
উৎসব ও দিবস উদ্যাপনের নতুন মাত্রা
প্রতিবছর জুলাই মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয় ‘বিশ্ব আইসক্রিম দিবস’। এবারের আইসক্রিম দিবস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটু ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। আইসক্রিমের বাজারে চাহিদা বাড়ছে বৈশাখ, ঈদ, পূজাসহ নানা উৎসব ঘিরে। এটি এখন আর কেবল শিশু-কিশোরদের শৌখিন খাবার নয়; বরং হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রিমিয়াম ফিউশনের নতুন স্বাদ নিয়ে এটি এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এক শিল্প।
.পরিসংখ্যানের বাজারের বাস্তবতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান বদলেছে। ফলে প্রক্রিয়াজাত খাবারের পেছনে ব্যয়ের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আইসক্রিমশিল্পে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনাল ও লাইটহাউস বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের আইসক্রিমের বাজারের আকার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এটি প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত মার্কএনটেলের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২০২৬ থেকে ৩০৩২ সাল পর্যন্ত গড়ে ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হবে।
এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আবহাওয়ার পরিবর্তন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে গ্রীষ্মকাল ও তীব্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব আগের চেয়ে দীর্ঘায়িত হয়েছে, যা আইসক্রিম বিক্রির ‘পিক সিজন’ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে বাজার বড় হলেও কাঁচামালের সংকট এখনো প্রকট। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন ও আইসক্রিম ম্যানুফ্যাকচারার্স ফোরামের তথ্যমতে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় দেশীয় দুধের জোগান অপর্যাপ্ত। ফলে উৎপাদকদের এখনো বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত মিল্ক পাউডার ও বাটার ফ্যাটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা শিল্পের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় ও লজিস্টিকসকে প্রভাবিত করছে।
.তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম: আইসক্রিমের বাজারে বিক্রির রেকর্ড
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের আইসক্রিমের বাজারে। এক দশক আগেও আইসক্রিমের মূল মৌসুম বা ‘পিক সিজন’ ছিল মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া বিরাজ করছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম আইসক্রিম কোম্পানিগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মৌসুম দীর্ঘ হওয়ায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ চক্র প্রায় বছরজুড়েই সক্রিয় থাকছে। ফলে অফ-সিজন বা শীতকালের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিক্রিতে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।
কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২১ সালেও দেশে আইসক্রিমের বাজারের আকার ছিল দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মধ্যে। ২০২৬ সালে এসে তা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ বিপুল প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে করপোরেট গ্রুপগুলোর মেগা বিনিয়োগ।
পোলার, সেভয়, ইগলু, জা এন জি ও লাভেলোর মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো নতুন করে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ময়মনসিংহের ভালুকা, ঢাকার সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সম্পূর্ণ অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। দেশীয় কারখানাগুলোর দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা এখন কয়েক লাখ লিটার। একসময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহঘাটতি থাকলেও আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অটোমেশনের ফলে কোম্পানিগুলো এখন দেশের ভেতরের শক্তিশালী চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি প্রস্তুত। কে কার চেয়ে কত বেশি উৎপাদনসক্ষমতা বাড়াতে পারে, তা নিয়ে চলছে রীতিমতো করপোরেট প্রতিযোগিতা।
.প্রিমিয়াম ফিউশনের নতুনত্ব
ভোক্তাদের লাইফস্টাইল ও রুচিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোক্তারা এখন আর শুধু সাধারণ ভ্যানিলা বা স্ট্রবেরিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা খুঁজছেন নতুন অভিজ্ঞতা। এ চাহিদাকে পুঁজি করেই বাজারে এসেছে প্রিমিয়াম ও ফিউশন স্বাদের নতুন জোয়ার। অতি সম্প্রতি বাজারে আসা ‘রোবাস্তো পিস্তা কুনাফা’ বা ‘বেলজিয়াম ডার্ক চকলেট’-এর মতো ইনোভেশনগুলো তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। রিটেইল চেইন সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার ডিপার্টমেন্টাল স্টোর—সবখানেই এখন প্রিমিয়াম আইসক্রিমের আলাদা কর্নার। কম দামি আইসক্রিমের চেয়ে বেশি মুনাফা মার্জিন থাকায় কোম্পানিগুলোও এখন গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।
.শুল্কের হিসাব ও কোল্ড চেইনের চ্যালেঞ্জ
বাজার বড় হলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের কপালে ভাঁজ ফেলছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইসক্রিম ব্র্যান্ড ইগলুর (আবদুল মোনেম লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান) বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জি এম কামরুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দেশে আইসক্রিমের বাজার বেশ বেড়েছে। বিভিন্ন স্বাদের নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ায় ক্রেতারা বেশ পছন্দ করছেন। তবে দেশি এ শিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আইসক্রিম উৎপাদনের মূল কাঁচামাল স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার ফ্যাট, কোকোয়া ও বিশেষ ফ্লেভার মূলত আমদানিনির্ভর। সাম্প্রতিক সময়ে বাজেটে আমদানি এসব কাঁচামালে শুল্ক ও কর বাড়ানো এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিসহায়তা পেলে দেশি শিল্পের প্রসার ঘটবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লজিস্টিকস বা কোল্ড চেইন মেইনটেইন করা। কারখানা থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আইসক্রিমকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে ও উপজেলা পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকা এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে কোল্ড চেইন ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রিটেইলারদের ফ্রিজার চালানোর খরচ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে শহরতলিতে বাজার যতটা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, গ্রামীণ বাজারে পৌঁছানো ততটাই ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং রয়ে গেছে।
কামরুল হাসান বলেন, গ্রীষ্মে আইসক্রিমের চাহিদা বাড়ে। ওই সময় লোডশেডিংও বেশি থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে এ খাতে ১০ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে নগরায়ণের পসার ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও কোল্ড চেইন লজিস্টিক সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।






