বাংলাদেশের জীবনবিমা খাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বিদেশি কোম্পানির হাতে গেল। শ্রীলঙ্কার জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান সফটলজিক লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসি দেশীয় ডায়মন্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ৬০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ ও ভারতের এলআইসির পর বাংলাদেশে তৃতীয় বিদেশি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম শুরু করল সফটলজিক।

অধিগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা সফররত সফটলজিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ শেয়ার কেনার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আমরা বাংলাদেশের জীবনবিমা খাতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে চাই।’

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার নিশ্চিত করেছেন যে, শ্রীলঙ্কার সফটলজিককে ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ শেয়ার কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, ১৯ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে এই শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩ কোটি টাকার বেশি। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ডায়মন্ড লাইফের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৮ কোটি টাকা।

ডায়মন্ড লাইফের চেয়ারম্যান রিয়াদ মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেড় বছর ধরে আলোচনা শেষে দুই সপ্তাহ আগে আমাদের ৬০ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কোম্পানিটি এরই মধ্যে তাদের মতো করে পরিচালনা করাও শুরু করেছে।’ কেন শেয়ার বিক্রি করা হলো, সেই প্রশ্নে তিনি জানান, ‘শ্রীলঙ্কার কোম্পানিটি ভালো। আর আমরা আসলে অন্য ব্যবসায়ে মনোযোগী।’

সফটলজিক কেবল আর্থিক বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়। শ্রীলঙ্কায় তাদের স্বাস্থ্যবিমা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) দাবি ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া কমিয়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সফটলজিক লাইফ শ্রীলঙ্কার দ্রুত বর্ধনশীল জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশটির জীবনবিমা শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ হলেও এই প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি ২৬ শতাংশ। গত চার বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রিমিয়াম আয়, কর-পূর্ব মুনাফা, কর-পরবর্তী মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ৩০ শতাংশের বেশি মূলধনের বিপরীতে মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমাপ্রতিষ্ঠান অ্যালিয়াঞ্জের স্থানীয় কোম্পানি অ্যালিয়াঞ্জ লাইফ ইনস্যুরেন্স লঙ্কাকেও অধিগ্রহণ করেছে সফটলজিক। প্রতিষ্ঠানটিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান নরফান্ড ও ওপি ফিনফান্ড কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে।

ডায়মন্ড লাইফের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার তুলনায় জীবনবিমা খাতের প্রসার সীমিত থাকলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ও আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই খাতে প্রবৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাই সফটলজিককে বিনিয়োগে আগ্রহী করেছে।

আইডিআরএকে জানানো হয়েছে, সফটলজিক লাইফ বাংলাদেশের গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিমা পণ্য, শক্তিশালী বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং করপোরেট সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেবে। শ্রীলঙ্কায় অর্জিত শৃঙ্খলাপূর্ণ কার্যক্রম ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে চায়।