২০২৬ বিশ্বকাপের আসরে ১ হাজার ২৪৮ জন ফুটবলার অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বড় একটি অংশ বিশ্ব ফুটবলে একেবারেই অপরিচিত অথবা খুব সামান্য পরিচিত ছিলেন। তবে এই টুর্নামেন্টের মঞ্চে নিজেদের অসাধারণ নৈপুণ্যের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন সাতজন খেলোয়াড়।

কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনিয়া সম্ভবত এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ‘আবিষ্কার’। সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ছোট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলেই চমক দেখিয়েছে, যার পেছনে ভোজিনিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শেষ ৩২-এ আর্জেন্টিনাকেও প্রায় আটকে ফেলেছিলেন তিনি। এই পারফরম্যান্সে দেশে জাতীয় বীর হয়ে উঠেছেন তিনি। বিশ্বকাপের আগে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার, যা বর্তমানে প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

মেক্সিকোর হয়ে নজর কেড়েছেন কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া ২৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনোনিয়েস, যিনি বর্তমানে সৌদি লিগে খেলছেন। বিশ্বকাপের আগে তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আজতেকায় উদ্বোধনী গোলটি তাঁর পা থেকেই আসে। এরপর গ্রুপ পর্বে চেক প্রজাতন্ত্র এবং শেষ ৩২-এ ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোল করেন তিনি। শেষ ১৬-তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর মোট ৪ গোল করে এক বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তিনি।

মরক্কোর হয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন ইসমায়েল সাইবারি। এক সময় তাঁর হাঁটাচলা নিয়ে সংশয় থাকলেও এই বিশ্বকাপে তিনি হয়ে উঠেছেন দলের প্রধান মুখ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৭১ সেকেন্ডে গোল করে মরক্কোর হয়ে দ্রুততম বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল পাওয়া সাইবারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ষোলোর টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টিটি সফল করেন। ডাচ লিগের গত মৌসুমের সেরা এই খেলোয়াড়কে ইতিমধ্যে দলে নিয়েছে বায়ার্ন। তবে চোটের কারণে শেষ আটে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলতে না পারাটাই তাঁর একমাত্র আক্ষেপ।

সুইজারল্যান্ডের ২০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ইয়োহান মানজাম্বি জন্ম নিয়েছেন জেনেভায়; তাঁর বাবা কঙ্গোর এবং মা অ্যাঙ্গোলার নাগরিক। গত বছর জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া এই তরুণ বসনিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১৯ মিনিটে জোড়া গোল করেন। এর ফলে তিনি সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে জোড়া গোল করা খেলোয়াড় হিসেবে নাম লেখান। কানাডার বিপক্ষে তাঁর জয়সূচক গোলে সুইজারল্যান্ড গ্রুপ-শীর্ষে ওঠে। যদিও শেষ ৩২-এর পর চোটের কারণে তিনি আর খেলতে পারেননি। প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব অ্যাস্টন ভিলা তাঁকে নিতে আগ্রহী বলে শোনা যাচ্ছে, যার পেছনে এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে চমক দেখিয়েছেন ফোলারিন বালোগান। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম এবং নাইজেরিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান বালোগান বড় হয়েছেন লন্ডনে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই ২ গোল করেন তিনি, যা ১৯৩০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ ম্যাচে প্রথম জোড়া গোলের কীর্তি। তবে গোলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনায়, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ফিফা স্থগিত করে। তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর প্রত্যাবর্তন তেমন স্মরণীয় হয়নি।

মরক্কোর ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ থেকেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আলো ছড়িয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন মরক্কোর মধ্যমাঠের প্রাণ। যদিও ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ আটে তাঁর স্বপ্নযাত্রা শেষ হয়, যে ফ্রান্সের হয়ে তিনি বয়সভিত্তিক ফুটবল খেলেছেন। বিশ্বকাপের মাত্র কয়েক মাস আগে মরক্কোর হয়ে তাঁর অভিষেক হলেও ইউরোপিয়ান মঞ্চে তিনি আগে থেকেই পরিচিত। লিলের হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফ্রেঞ্চ লিগে অভিষেক এবং ১৭ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার রেকর্ড তাঁর রয়েছে।

মিসরের মোস্তফা জিকোর জীবন বদলে গেছে একটি ফোনকলের মাধ্যমে। ২৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের আগে প্রীতি ম্যাচে মিসরের হয়ে অভিষেক হয় তাঁর। বিশ্বকাপে ২ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট করে নিজেকে চিনিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাঁর করা একটি গোল ভিআর-এর মাধ্যমে বাতিল হওয়ায় সেটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ব্রাজিল কিংবদন্তি জিকোর নামে নাম রাখা এই ফুটবলার নিচের সারির ক্লাব এবং বাবাকে হারানোর শোক ও পারিবারিক চাপ কাটিয়ে এখন মিসরের জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছেন।