পেশাগত দায়িত্ব, সংসার এবং দুই সন্তানের ব্যস্ততার মাঝেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সাজিয়া সুলতানা। কঠোর পরিশ্রম আর সংকল্পের জোরে তিনি এবার অংশ নিতে যাচ্ছেন ‘আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ। সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের সমন্বয়ে গঠিত ট্রায়াথলনের অন্যতম কঠিন এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন তিনি।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের নিস শহরে অনুষ্ঠিত হবে এই বিশ্ব আসর। এর আগে গত ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়োজিত আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ অ্যাথলেটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাজিয়া। সেখানে ‘নারী ৪০-৪৪’ শ্রেণিতে ৭ ঘণ্টা ৩১ সেকেন্ড সময় নিয়ে সফলভাবে তিনটি ধাপ সম্পন্ন করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের টিকিট নিশ্চিত করেন তিনি।

আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত কঠিন। প্রতিযোগীদের কোনো বিরতি ছাড়াই টানা ১.৯ কিলোমিটার সাঁতার, ৯০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ২১.১ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয়, যা শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতার চরম পরীক্ষা।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সাগরপাড়ে বেড়ে ওঠা সাজিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি)-তে জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত।

পেশা ও সংসারের পাশাপাশি ভোরবেলার কঠোর অনুশীলনকে জীবনযাপনের অংশ করে নিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে ট্রায়াথলনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিরাপদ সাইক্লিং রুট ও উন্নত সাঁতারের সুবিধার সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিবার ও কোচের সহায়তায় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন সাজিয়া। এই যাত্রায় তাঁর স্বামী ডিপিডিসির কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম এবং দুই ছেলের উৎসাহ তাঁকে সাহস জুগিয়েছে।

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সাজিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ফিনিশিং লাইনে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে পৌঁছানোর মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। তখন মনে হয়েছে, আমি শুধু একটি রেস শেষ করিনি; বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করেছি।’

তবে বিশ্বমঞ্চে যাওয়ার এই মুহূর্তে আর্থিক সংকটের কথা জানান তিনি। সাজিয়া আরও বলেন, ‘এখন মাথার ওপরে একটা বেশ বড় চাপ রয়েছে। আয়রনম্যান ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা। বিশেষায়িত সরঞ্জাম, উচ্চমূল্যের নিবন্ধন ফি, নিয়মিত কঠোর প্রশিক্ষণ ও বিদেশে ভ্রমণের বিশাল খরচ এযাবৎ নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বহন করে এসেছি। বিশ্বমঞ্চে যাওয়ার এই শেষ মুহূর্তে এসে নিজের জমানো সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এই ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতার খরচ মেটাতে এখন দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে রাস্তাটি আরও সহজ হতো আমার জন্য।’

সাজিয়ার পাশাপাশি আরও একজন নারী ট্রায়াথলেট ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া (১৮-২৪ বয়স শ্রেণি) ফ্রান্সের টিকিট নিশ্চিত করেছেন। প্রথমবারের মতো দুজন বাংলাদেশি নারী অ্যাথলেট একসঙ্গে আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।