জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম শিক্ষক সংকটের মুখে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। পাঁচটি পদের মধ্যে চারটি শূন্য থাকায় গত ১৫ জানুয়ারি থেকে মাত্র একজন শিক্ষকের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি বাড়ছে এবং ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রাক্-প্রাথমিকে ১৭, প্রথম শ্রেণিতে ১১, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০, চতুর্থ শ্রেণিতে ১০ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১১ জনসহ মোট ৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে প্রতিদিন গড়ে উপস্থিত থাকে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ১০ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পড়াচ্ছেন প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোয় একটি একতলা পাকা ভবনে দুটি এবং টিনশেড ঘরে দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবদুল মমিন জানান, তাঁর যোগদানের সময় আরও তিনজন সহকারী শিক্ষক ছিলেন, যারা পর্যায়ক্রমে অবসরে যান। এরপর মৌখিকভাবে আসা একজন শিক্ষক চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অবসরে চলে যাওয়ায় তিনি একাই সব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "প্রায়ই তাঁকে দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে উপজেলা সদরে যেতে হতো। তবে এখন ক্লাস শেষ করে বিভিন্ন সময়ে দাপ্তরিক কাজ করে থাকেন। শিক্ষক না থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে চান না।"
স্থানীয় বাসিন্দারা এই সংকট নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করার পর গত ৯ জুলাই শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় পাশের একটি বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষককে মৌখিকভাবে পাঠদান করতে বলে। তবে এখনো কাউকে স্থায়ীভাবে পদায়ন করা হয়নি।
গ্রামের বাসিন্দা মিন্টু মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "একজন শিক্ষক কীভাবে এতগুলো ক্লাস নেবেন। তারপরও তিনি যেটুকু পারেন, সেটুকু পড়ান। শিক্ষক-সংকটের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। তাঁরা চান, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হোক।"
মাদারগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত। স্থানীয়দের মতে, কাঁচা রাস্তার কারণে যানবাহন পাওয়া যায় না এবং বৃষ্টির সময় মোটরসাইকেল চালানোও কষ্টকর হয়ে পড়ে, যার ফলে শিক্ষকেরা এখানে আসতে চান না।
ছয়-সাত বছর আগে এখানে প্রায় ১২০ শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদিক ইসলাম, মো. আলামিন ও তামান্না আক্তার মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, শিক্ষক না থাকায় ঠিকমতো ক্লাস হয় না, অনেক সময় তারা নিজেদের মধ্যে বসে থাকে এবং একসঙ্গে দুই শ্রেণির ক্লাস করতে হয়। তাদের মতে, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে পড়াশোনার মান উন্নত হতো।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, মাদারগঞ্জের ২০১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ হাজার ২৩৬টি পদের বিপরীতে ১ হাজার ৮৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন; অর্থাৎ ১৪৮টি পদ শূন্য।
জামালপুরের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, "যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ার ফলে সেখানে শিক্ষকেরা যেতে চান না। এ ছাড়া শিক্ষক–সংকটও রয়েছে। তবে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-সংকটের বিষয়টি জেনে গত সপ্তাহে একজন শিক্ষককে পাঠদান করতে বলা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক পদায়নের ব্যবস্থা করা হবে।"