এ সপ্তাহে টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জনজীবন। মাসের শুরুতে আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ চলে এসেছিল আষাঢ়েও। মাঠের কৃষকদের উৎকণ্ঠা ছিল চরমে; সময়মতো বৃষ্টি না এলে পাট চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। অন্যদিকে নগরজীবনেও ছিল অসহনীয় গরম। তবে শেষমেশ ঝেঁপে এসেছে বৃষ্টি, তবে তা বিরামহীন। শহরের রাস্তাগুলো এখন খালের মতো জলমগ্ন। একে বন্যা না বলে জলজট বলাই শ্রেয়। পরিস্থিতি এমন যে, কেউ রসিকতা করে বলেছেন, এখন গাড়ি নয় বরং স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রকৃতি বরাবরই খেয়ালি, মানুষের তৈরি নিয়মে সে চলে না। সামান্য বিচ্যুতি হলেই আমরা একে জলবায়ু পরিবর্তন বলে অভিহিত করি। বৃষ্টির সময় ও স্থান পরিবর্তিত হলেও বছর শেষে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণে তেমন হেরফের হয় না। শৈশবে স্কুলে আমরা বর্ষাকাল নিয়ে রচনা লিখতাম কিংবা বন্যায় আশীর্বাদ না অভিশাপ তা নিয়ে বিতর্ক করতাম। যারা আশীর্বাদের পক্ষে যুক্তি দিতাম, আমাদের অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হতো বন্যা কীভাবে ভালো হতে পারে।

১৯৭০-এর দশক থেকে দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়েছে। বাঁধের ভেতরের বাসিন্দারা নিরাপদ থাকায় তারা আরও বাঁধ চান। তবে অতিবৃষ্টি বা স্রোতের তোড়ে অনেক সময় মাটির বাঁধ ভেঙে যায়, যা মূলত ‘হিউম্যান এরর’ বা মানবসৃষ্ট ত্রুটি। দুর্বল নির্মাণ কিংবা স্থানীয় নেতা, কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে দুর্নীতির কারণে মানহীন বাঁধগুলো ভেঙে পড়ে। আবার দেশে একটি বাঁধবিরোধী লবিও রয়েছে, যারা ‘বানের সঙ্গে বসবাস’ তত্ত্বে বিশ্বাসী। মজার বিষয় হলো, যারা ইটের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকেন, তারাই অনেক সময় বাঁধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন এবং ইটভাটা বন্ধের কথা বলেন।

বন্যানিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রচুর ঋণ ও অনুদান দেয়। লেখক লক্ষ্য করেছেন, কোনো কোনো দেশ একদিকে সরকারকে বাঁধ নির্মাণের অর্থ দেয়, আবার অন্যদিকে এনজিওর মাধ্যমে বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও সেমিনারের আয়োজন করে। এটি যেন এক অদ্ভুত খেলা।

টানা বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা ডুবে যাওয়ায় একে ‘ভেনিস’ এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানীর র‍্যাম দিয়ে গাড়ি নামার দৃশ্যটি ছিল অদ্ভুত। বৃষ্টির এক দিক কাব্যিক হলেও অন্য দিকটি অত্যন্ত করুণ। বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনামে এই দুর্যোগের প্রতিফলন দেখা গেছে। যেমন—মুক্তকণ্ঠ লিখেছে ‘ঢাকায় টাকা ঢেলেও জলাবদ্ধতা’, যুগান্তর লিখেছে ‘ভারী বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা’, সমকাল লিখেছে ‘দুর্যোগে পানিবন্দী মানুষ’, আগামীর সময় লিখেছে ‘ঢাকাডুবি’, আমার দেশ লিখেছে ‘বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা’, বিবিসি বাংলা জানিয়েছে ‘সাত জেলায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী’, দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে ‘ডাউনপোর ডাউন ঢাকা’ এবং নিউ এজ লিখেছে ‘ফ্লাডিং ওয়ার্সেন্স, ডেথ টোল ক্লাইম্বস টু ফিফটি ওয়ান’।

মুক্তকণ্ঠ-এর একটি সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের শেলী আক্তারের আর্তনাদ তুলে ধরেছেন। শেলী আক্তার বলেন, “চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বইন্যার পানি হত্তে নামিব, ন জানি। এ রহম দুর্দশাত ক্যানে পইড়লাম। আরেক্কান ঘর তুলিবার টিঁয়াও নাই।” ছয় সন্তান নিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তায় মাচা বানিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তাঁর মতো অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো মানুষের।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ ৫৯টি উপজেলা বন্যাপ্লাবিত হয়েছে। বন্যায় পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন (মুক্তকণ্ঠ, ১৩ জুলাই ২০২৬)। সংখ্যাতত্ত্বের বাইরেও মানুষের কষ্ট অপরিসীম। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, এমনকি মৃতদেহ দাফনের জন্য শুকনো জমির সংকট দেখা দিয়েছে। এরপর ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুর মতো মড়কের আশঙ্কা বাড়ছে।

গণমাধ্যমের স্থানীয় সংবাদদাতারা সাধারণত জেলা প্রশাসক বা মন্ত্রীর বক্তব্য এবং সরকারি বরাদ্দের খবরের ওপর গুরুত্ব দেন, যার ফলে প্রকৃত অনুসন্ধান অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায়। এছাড়া সাহায্য পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সব সিদ্ধান্ত ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়া; স্থানীয় সরকারের ভূমিকা এখানে নগণ্য।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, “জলবায়ু পরিবর্তন বলি আর এল নিনো বলি, সামনের দিনগুলো আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের আগাম প্রস্তুতি কতটুকু? আগে দেখেছি, কোনো দুর্যোগ এলে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্তারা সরকারপ্রধানের দরবারে হাজির হন, অনুদানের চেক দেন। এটি নিয়ে ফটোসেশন হয়। দানদক্ষিণা হয় ঢাকঢোল পিটিয়ে। মানুষ আর এর পুনরাবৃত্তি চায় না।”