চার বছর পরপর ফিফা বিশ্বকাপ যেন কয়েক দিনের জন্য বদলে দেয় মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা—দেশের সীমারেখা, ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য পেরিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ভাগাভাগি আবেগ। একটি জয় কিংবা একটি পরাজয় ঘিরে কাঁদায় ও হাসায় অংশ নেন কোটি কোটি মানুষ। ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজনটিকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।

চলমান আসরের আগে ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপের ২২টি আসরের প্রতিটিই নতুন গল্প, নতুন ইতিহাস আর স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। সেই উত্তেজনা ও নাটকীয়তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ফাইনালের মঞ্চে। এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২৩তম আসর, যা আয়োজকদের ভাষায় আগের যেকোনো আয়োজনের চেয়ে বড় ও জমজমাট। এ আসরে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে ৪৮টি দল। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রতিটি ম্যাচ জন্ম দিয়েছে সমর্থকদের আনন্দ, উত্তেজনা এবং প্রিয় দলের হার-জিত ঘিরে নানা আবেগের।

এই ফুটবল মহাযজ্ঞের শেষ অধ্যায় লেখা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিশ্বখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ভেন্যুতে এরই মধ্যে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাইরের চেহারায় মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে আধুনিক ও ১০টি স্টেডিয়ামের মতোই মনে হতে পারে। তবে ভেতরে গেলে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি মাঠ নয়—বিশাল পরিসরের এক ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত।

প্রায় ২১ লাখ বর্গফুট আয়তনের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে একসঙ্গে বসতে পারেন ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক। ফলে ফাইনালের দিন গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের উপস্থিতি পুরো নিউ জার্সি জুড়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করবে।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের পরিচয় শুধু বিশ্বকাপ ঘিরেই নয়। কোপা আমেরিকার ফাইনাল, এনএফএলের রোমাঞ্চকর ম্যাচ এবং রেসলম্যানিয়ার মতো বড় আয়োজনও এই ভেন্যুতে হয়েছে। খেলার পাশাপাশি বিনোদনপ্রেমীদের কাছেও এটি পরিচিত ঠিকানা। টেইলর সুইফট, বিটিএস, বিয়ন্সে ও ব্রুনো মার্সের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের কনসার্টে আলো, সংগীত আর দর্শকদের উন্মাদনায় মেটলাইফের রাতও বহুবার রঙিন হয়েছে।

২০১১ সালে ২৫ বছরের নামকরণ-স্বত্ব চুক্তির মাধ্যমে ভেন্যুটির নাম রাখা হয় ‘মেটলাইফ স্টেডিয়াম’। স্টেডিয়ামের বাইরে বিশ্বজুড়ে মানুষের আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশেও ৭৪ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এবারের বিশ্বকাপ আসরে খেলতে আসা ৪৮টি দেশের মধ্যে ২৪টি দেশেই উপস্থিতি আছে মেটলাইফের।

১৯ জুলাই এই স্টেডিয়ামেই রচিত হবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে এক দলের হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি, আরেক দলের বুকে সুর তুলবে স্বপ্নছোঁয়ার এক কদম দূরত্বে থাকা হাহাকারের গান। গ্যালারিতে একদল মাতবে আনন্দ–উল্লাসে, আরেক দলের বেদনার অশ্রুতে ভাসবে চোখ। মাঠে কেউ হয়ে উঠবে জাতীয় বীর, আবার কেউ হয়তো একটি ভুলের জন্য সেই রাতটিকে ভুলতে পারবে না আজীবন। সব আলো থাকবে বিশ্বজয়ী দলের ওপর। আর এত সব ঘটনা ও নতুন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে মেটলাইফ স্টেডিয়াম।