দেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের প্রকোপ এবং সরকারি চাকরির প্রতি প্রবল আগ্রহের এক চরম চিত্র ফুটে উঠেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। জাতীয় বেতনকাঠামোর ১৬তম ধাপের তৃতীয় শ্রেণির ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে ৩১২ জনকে নিয়োগের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯টি। এর ফলে প্রতি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গড়ে ৩ হাজার ৯৫৬ জন প্রার্থী।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই পদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস হলেও আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা মূলত সরকারের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-উপবৃত্তি এবং মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীসহ বিভিন্ন ভাতার তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণে সহায়তা করেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। জরিপে বলা হয়েছে, "দেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী। আর দুই বছরের বেশি বেকার এমন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী সবচেয়ে বেশি।"

বর্তমানে এই পদের মূল বেতন মাসে ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু হয়, যার সাথে এলাকাভেদে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য সরকারি ভাতা যুক্ত থাকে। নতুন বেতনকাঠামোয় এই বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

বেকারত্বের এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় বিবিএস-এর অন্য তথ্যে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার, যার মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার। বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সরকারি চাকরির স্থায়িত্ব ও সামাজিক মর্যাদার কারণেই উচ্চশিক্ষিতরা নিম্ন পদের চাকরিতেও আগ্রহী হচ্ছেন।

সম্প্রতি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় এসএসসি পাসের অফিস সহায়ক পদে ১৮ জনের নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। দেখা গেছে, ২০তম গ্রেডের এই পদের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএসহ মাস্টার্স ও অনার্স ডিগ্রিধারী।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "দেখা যাচ্ছে সরকারি চাকরিতে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। সবাই চায় একটি স্থায়ী চাকরি ও নিশ্চিন্ত জীবন।" তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগ পরীক্ষা স্বচ্ছ হবে।

উল্লেখ্য, সমাজসেবা অধিদপ্তর গত ২৪ মে ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে সংশোধিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল, যার আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২৩ জুন। ৫২টি ভিন্ন শ্রেণিতে মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি আবেদন জমা পড়েছে, যার ফলে প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে ১ হাজার ৪৩০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ১৩তম গ্রেডের প্রধান সহকারীর ১৮টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ১৫৯ জন (প্রতি পদে ৬ হাজার ৩৪২ জন) এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের ৭৬টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১ লাখ ৮৬৩ জন (প্রতি পদে ১ হাজার ৩২৭ জন)।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০২৫’ প্রতিবেদনের খসড়া অনুযায়ী, দেশের বেসামরিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থাৎ ৫ লাখ ২২ হাজার পদ এখনো শূন্য।

সরকারের সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর আবদুল আউয়াল মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "সরকারি চাকরি সহজে যায় না। নিরাপদ হওয়ার কারণে মানুষের কাছে এখনো অগ্রাধিকারের তালিকা সরকারি চাকরি। তা ছাড়া সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। সে কারণে অল্প পদের বিপরীতে অধিক সংখ্যক প্রার্থী অংশ নিয়ে থাকে।"

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, "সব পদে ঘুষ নেই; আবার অনেকে ঘুষ নেন না। আবার অনেকে টাকা দিয়ে চাকরি নেন। যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি নেন, তাঁরা কাজ করেন না। তাঁদের মূল লক্ষ্য থাকে টাকা তোলা। তাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের এসব চাকরি যেন অবশ্যই স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়।"

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তা এবং শ্রম আইনের দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে তরুণরা সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তরুণ মুক্তকণ্ঠকে জানান, ১৬টি চাকরিতে আবেদন করার পর তিনি মনে করেন, "নিশ্চয়তা, সুযোগ-সুবিধা ও পরিশ্রম বিবেচনায় সরকারি চাকরি এখন অনেক আকর্ষণীয়।" তাই তিনি সরকারি চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।