বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। দেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি এবং বেসরকারি বিদ্যালয় ৫৩ হাজার ৩৮টি। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ে ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬ জন। লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে ছাত্র ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬২ এবং ছাত্রী ১ কোটি ৩ লাখ ২৯ হাজার ৮৬ জন। এছাড়া ৮১ হাজার ২৩০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে অধ্যয়নরত। সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ শিক্ষক কর্মরত আছেন, যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন। বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২৮ এবং শতভাগ উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে উপবৃত্তি প্রদানের হার ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে।

শিক্ষা হলো অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। স্থিতিশীল উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) চতুর্থ লক্ষ্য ‘সকলের জন্য সম্মতিপূর্ণ শিক্ষা’ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পুনরায় শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে দেশগুলো বেগ পেতে হচ্ছে। বর্তমান সময়ে কেবল শিক্ষার বিস্তার নয়, বরং গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাণবন্ত সমাজ গঠনে প্রাথমিক পর্যায়েই মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র একটি অভিন্ন ও জনকল্যাণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে আইন দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুকে বিনা মূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় আনার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিশুর জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের প্রথম ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই একে কেবল প্রশাসনিক খাত হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের সংকট, প্রশাসনিক জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক দায়িত্ব শিক্ষার গুণগত মানকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক ফয়সাল হাবিব সরকারের প্রতি ১৮টি সুপারিশ তুলে ধরেছেন। সুপারিশগুলো হলো—

১. প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ক্লার্ক নিয়োগ করুন, যাতে শিক্ষকেরা প্রশাসনিক কাজের পরিবর্তে পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন।
২. বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ প্রদান।
৩. স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একজন স্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ প্রদান।
৪. দাপ্তরিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন পিয়ন নিয়োগ প্রদান।
৫. বিদ্যালয়ের ভবন, আসবাব ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একজন নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রদান।
৬. প্রতিটি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, স্টোররুম, শিক্ষক কমনরুম, শিক্ষার্থী কমনরুম, মাল্টিমিডিয়া রুম ও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষসহ কমপক্ষে ১২টি কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণ।
৭. প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে অন্তত ১৪ যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রদান।
৮. শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের, নিয়মিত ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে তাঁরা আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।
৯. দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অনিয়ম ও কর্তব্যে অবহেলার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান ও দক্ষ শিক্ষকদের যথাযথ স্বীকৃতি ও পুরস্কার প্রদান।
১০. শিক্ষকদের ভোটার তালিকা, জনশুমারি, নির্বাচন ও অন্যান্য অশিক্ষামূলক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁদের সম্পূর্ণ কর্মঘণ্টা শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা।
১১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করে ধাপে ধাপে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ।
১২. প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক আইসিটি ল্যাব, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ ও একজন দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ প্রদান।
১৩. শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন খেলার শিক্ষক ও একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ প্রদান।
১৪. বিদ্যালয়ের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি ক্লাস্টারে একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক নিয়োগ প্রদান।
১৫. দুর্গম, পাহাড়ি, হাওর ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য সরকারি আবাসন, বিশেষ যাতায়াত ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা।
১৬. যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দ্রুত পদোন্নতি ও উচ্চতর বেতন স্কেলের একটি স্বচ্ছ ও স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা।
১৭. প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ডে–কেয়ার সেন্টারের সুবিধা নিশ্চিতকরণ।
১৮. প্রাক্‌–প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য শতভাগ বিনা মূল্যে মানসম্মত ও পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি চালু করুন, যাতে অপুষ্টি কমে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ে ও শেখার পরিবেশ আরও উন্নত হয়।

লেখক মনে করেন, আধুনিক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষক, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে, যার সুফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।