চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রাজস্ব আহরণ জোরদার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করার প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না হলে মধ্য মেয়াদে এই প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল তাদের ঢাকা সফরের শেষ দিনে এক বিবৃতিতে এই পূর্বাভাস প্রদান করে। ১২ জুলাই থেকে মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। সফরের শেষ দিনে তারা সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে মিশনটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চারটি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বেকারত্ব বাড়তে পারে এবং শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পেতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় ও ভোগ ব্যয় কমে পুরো অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, "নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগে যেসব নীতিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর ওপরই এই কর্মসূচির ভিত্তি দাঁড়াবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান বজায় রেখেই সংস্কারের কাজ পরিচালিত হবে। যখন যেটা প্রয়োজন হবে, সেটাই করা হবে। এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাকি পরিবর্তনগুলোও সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।"
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সফরের পর আইএমএফের সঙ্গে কয়েকটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হবে। এরপর অক্টোবরে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে এবং পরবর্তীতে আরেকটি মিশন ঢাকায় আসবে। আশা করা হচ্ছে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যে নতুন ঋণের চুক্তি হতে পারে।
আইএমএফ তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকারের অনুরোধে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করাই ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালের আর্টিকেল ৪-এর পরামর্শ প্রতিবেদনে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই সফর পরিচালিত হয়েছে।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আরও তীব্র হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়িয়েছে এবং ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকলেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক খাতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং ব্যাংক খাতের সংকট এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে রাজস্ব আহরণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভর্তুকি যৌক্তিক করা প্রয়োজন। লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি ফলপ্রসূ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, ২০২৫ সালে চালু করা ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বিনিময় হার আরও নমনীয় হবে এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত থাকবে। উল্লেখ্য, ক্রলিং পেগ হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মুদ্রার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট নিয়মে ধাপে ধাপে সমন্বয় করে।
ব্যাংক খাতের বিষয়ে আইএমএফ বলেছে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের ভিত্তিতে হতে হবে যাতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা পায় এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়।
মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার বলেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইএমএফের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছে। এই সফর সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "নতুন ঋণ কর্মসূচির বিভিন্ন দিক, কর্মসূচির আকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার অঙ্গীকার ইত্যাদি নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও আলোচনা করা হবে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আইএমএফ আশাবাদী।"