দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তাদের তৈরি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় সংরক্ষণ কক্ষের পরিবেশের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখবে সেন্সর। তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিবর্তন শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন–এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সংরক্ষণকালীন পেঁয়াজের ক্ষতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা বলছেন–এটি এখনও চূড়ান্ত ফল নয়। গবেষণাটি চলছে পরীক্ষামূলক ও ফলাফল বিশ্লেষণ পর্যায়ে। বৃহত্তর পরিসরে বাস্তব সংরক্ষণ পরিবেশে পরীক্ষা শেষে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি। তারপরও বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দেয়, বাড়ে আমদানির প্রয়োজন। এর পেছনে বড় একটি কারণ সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। মাঠ থেকে ঘরে তোলার পর দীর্ঘ দিন ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় পচে যায় পেঁয়াজ। কমে ওজন, শুরু হয় অঙ্কুরোদগম। নষ্ট হয় গুণগত মানও। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে সাফল্য থাকলেও সংরক্ষণপরবর্তী অপচয়ে সেই সাফল্যের একটি অংশ হারিয়ে যায়। গবেষণায় শতভাগ সাফল্য পেলে দেশে পেঁয়াজের ক্ষতি ঠেকাতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন হবে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইসিটি সেলের পরিচালক ও কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী। তার সঙ্গে রয়েছেন সহকারী গবেষক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম এবং স্নাতক শিক্ষার্থী রাহাত মিয়া। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে ২০২৫ সালের মার্চে গবেষণাটি শুরু হয়।
অধ্যাপক রোস্তম আলীর নেতৃত্বাধীন দলটি এমন একটি সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে পেঁয়াজ রাখার পরিবেশ শুধু পর্যবেক্ষণ করে থেমে থাকতে না হয়; প্রয়োজন অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণও করা যায়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, গবেষণা চলমান থাকলেও ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছেন। তাদের তথ্যমতে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আইওটি-ভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহারে পেঁয়াজের সংরক্ষণকালীন ক্ষতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে এই ফল বৃহত্তর পরিসরে একইভাবে পাওয়া যাবে কি না, সেটিই এখন যাচাইয়ের বিষয়। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ দিন পেঁয়াজ ভালো রাখার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরিবেশগত উপাদানের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমানো সম্ভব।
প্রচলিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণাগারের পরিবেশের পরিবর্তন সব সময় তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা কঠিন। ফলে কোনো অংশে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা তাপমাত্রা তৈরি হলে তা ধরা পড়তে সময় লাগে। এর মধ্যে পেঁয়াজে পচন শুরু হতে পারে। গবেষকেরা এই জায়গাতে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে চাইছেন।
তাদের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় সংরক্ষিত পেঁয়াজের ভেতরে সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সেন্সর থেকে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য সংগ্রহ করা হবে। সংরক্ষণ পরিবেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবর্তন দেখা দিলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা সক্রিয় করা যাবে। এ জন্য ব্যবস্থাটিতে এয়ারফ্লো বা বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু বা বন্ধ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
গবেষকরা শুধু পেঁয়াজ কতদিন ভালো থাকছে, তা দেখছেন না। সংরক্ষণকালে পেঁয়াজের ওজন কতটা কমছে, কতটা পচছে এবং গুণগত মানে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেসব তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে পাওয়া তথ্য তুলনা করে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক রোস্তম আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "তুলনামূলক কম খরচে এমন একটি আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য, যেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণের পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পচন, ওজন হ্রাসসহ অন্যান্য ক্ষতি কমানো এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪২ দশমিক ৬৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি। তারপরও আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। বিশেষ করে মৌসুম শেষে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেলে বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং আমদানির প্রয়োজন দেখা দেয়। এখানেই সংরক্ষণব্যবস্থার গুরুত্ব। কৃষকের ঘরে তোলার পর পেঁয়াজ যদি দীর্ঘ দিন ভালো রাখা যায়, তাহলে মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ার চাপ কমবে। কৃষকও তাৎক্ষণিক বিক্রির বদলে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিক্রির সময় ঠিক করার সুযোগ পাবেন। কমে আসবে আমদানি নির্ভরতা।
অধ্যাপক রোস্তম আলীর মতে, সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক কৃষক ফসল তোলার পর পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির ঝুঁকি থাকে। উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা থাকলে কৃষক কিছু দিন পেঁয়াজ ধরে রেখে তুলনামূলক ভালো সময়ে বিক্রি করতে পারবেন। একই সঙ্গে সারা বছর বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
তিনি বলছিলেন, "সার্বিক দিক বিবেচনায় তাদের গবেষণাটির লক্ষ্য পেঁয়াজের ফলন বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদনের পর যে অংশ পচন, ওজন হ্রাস ও গুণগত মান নষ্ট হওয়ার কারণে হারিয়ে যায়, সেই ক্ষতি কমানো।"
রোস্তম আলীর মতে, বাংলাদেশে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন কৃষক যে পেঁয়াজ উৎপাদন করেন, তার সবটুকু যদি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বাড়তি উৎপাদনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না। সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নতি তাই কৃষকের আয়, বাজারের সরবরাহ এবং ভোক্তার দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণকেন্দ্রে পাইলট পর্যায়ে প্রযুক্তিটি প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আধুনিক সেন্সর, তথ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী একটি পাইলট মডেল তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। এরপর সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা পাওয়া গেলে সফল মডেলটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, পেঁয়াজের বাজারে প্রতি বছর যে চক্র দেখা যায়, এই প্রযুক্তি সফল হলে সেটিতেও কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। মৌসুমে পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম পড়ে যাওয়ার চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। আবার মৌসুমের বাইরে সরবরাহ কমে গেলে সংরক্ষিত পেঁয়াজ বাজারে আনা যাবে। এতে বাজারে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ আরও ধারাবাহিক হতে পারে। এর ফলে আমদানির প্রয়োজনও কমতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিটির মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের খরচের ওপর।
অধ্যাপক রোস্তম আলী জানান, তাদের প্রযুক্তিটি মাঠ পর্যায়ে নিতে হলে শুধু গবেষণাগারে ভালো ফল পাওয়া যথেষ্ট নয়। সংরক্ষণাগারের আকার, বিদ্যুৎ খরচ, সেন্সরের স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং কৃষকের ব্যবহারযোগ্যতা—সব কিছু বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কৃষকের জন্য প্রযুক্তিটি কতটা সাশ্রয়ী হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা সেই ধাপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, "গবেষণাটি এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পরীক্ষামূলক ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করার কাজ চলছে। পরবর্তী ধাপে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তব সংরক্ষণ পরিবেশে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।"