নির্মাণশ্রমিকদের সরদার জয়নাল মিয়া (৫০) ও তাঁর সঙ্গে থাকা শ্রমিকদের একটি অংশ প্রায় চার দশক ধরে যানজটের দীর্ঘ ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। পাওয়ার টিলারে নারী-পুরুষসহ মোট ১৬ জন নির্মাণশ্রমিক নিয়ে যেতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে দুই মহাসড়কের প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। আনুমানিক ২৫০ মিটার রাস্তা পার হতে তাঁদের সময় লেগেছে ৪০ মিনিট। যানজটের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, কমছে সরদারের আয়। টানা কয়েক দিন ধরে তাঁদের মতো হাজারো পথচারী, যাত্রী ও চালকও একই দুর্ভোগে রয়েছেন।

ঢাকা-সিলেট ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার কাছাকাছি সময়ে সরাইলে যানজটের চিত্র দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা তৃতীয় দিনের মতোই যান চলাচলে ভোগান্তি থাকছে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া যানজট মঙ্গলবার ও বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত ছিল। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি যান চলাচল।

জয়নাল মিয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রামের বাসিন্দা। প্রতিদিন পাওয়ার টিলারে নির্মাণশ্রমিকদের নিয়ে তাঁরা জেলার নাসিরনগর উপজেলায় যান, যেখানে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন ভবনে ঢালাইয়ের কাজ করেন। একজন মিস্ত্রি থেকে দৈনিক গড়ে ৭৫ টাকা এবং শ্রমিক থেকে ৫০ টাকা করে পান জয়নাল। তিনি ২০ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত।

জয়নালের ভাষ্য, যানজটের কারণে ব্যয় বাড়ছে, আয় কমছে এবং শ্রমিক কমিয়ে আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সুহিলপুর থেকে সরাইল পর্যন্ত প্রতিদিন ৫-৭ কিলোমিটার পথ সড়কে আটকা থাকতে হয়। সকালে গড়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা এবং বিকেলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আটকা পড়ি। আগে কাজে ২০-২২ জন শ্রমিক নিয়ে যেতাম। তিন দিন ধরে ১৬ জন নিয়ে যাচ্ছি। সরকার চাইলেই এক থেকে দুই মাসে যানজটের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু আট বছরেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আমরা আর সহ্য করতে পারছি না।’

যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত সরাইল খাঁটিহাতা হাইওয়ে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জুয়েল আহমেদ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সরু রাস্তা। দ্বিতীয়ত, সড়কে কার আগে কে যাবে, সেই প্রতিযোগিতা। চালকদের কেউই আমাদের সংকেত মানছেন না, আইনও মানছেন না।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত সরাইল উপজেলার শান্তিনগর থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় ও কুট্টাপাড়া হয়ে বারিউড়া পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় আট কিলোমিটার অংশজুড়ে যানজট দেখা দেয়। বিশ্বরোড মোড় থেকে দক্ষিণে সদর উপজেলার নন্দনপুর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট চলতে দেখা গেছে। সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক মহাসড়কের এক কিলোমিটার অংশেও যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরের চারদিকের মধ্যে শুধু ঢাকা থেকে সিলেটগামী অংশের নতুন একটি লেন খোলা রাখা হয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকা ও কুমিল্লাগামী পুরোনো দুটি লেন বন্ধ থাকায় যানবাহনের চাপ একটি পথেই পড়ছে। গোলচত্বরের তিন-চতুর্থাংশজুড়ে নির্মাণকাজ চলায় সড়কে সংকট আরও বাড়ছে বলে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়। সরু সড়ক এবং গর্ত পার হতে পণ্যবাহী যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গোলচত্বরের তিন পাশে সিএনজিচালিত অটোরিকশার তিনটি অবৈধ স্ট্যান্ডও যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি সড়কে ইজিবাইকের অবাধ বিচরণও দেখা যায়।

বিশ্বরোড মোড়ের বড় গর্তের কারণে অল্প রাস্তা পার হতেও আধা ঘণ্টা সময় লাগে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকাগামী ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্সপ্রেস বাসের চালক মোশারফ হোসেন।

সরু সড়ক, গর্ত ও আইন না মানার প্রবণতার কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান সরাইল খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু তাহের দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আমরা দায়িত্ব পালন করছি। ধুলো আর রোদে কাজ করতে গিয়ে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরও আমরা যানজট কমাতে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’