চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো দেশে ফ্রি ট্রেড জোন বা মুক্তবাণিজ্য এলাকা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ঋণপত্র (এলসি) ছাড়াই পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা কীভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন, সেই বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার একটি নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো লেনদেন সহজ করা এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নতুন এই কাঠামোর আওতায় অনুমোদিত ডিলার (এডি) এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার আলোকে এফটিজেড-সংশ্লিষ্ট লেনদেন পরিচালনা করবে। উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অনুমোদিত ট্রেডিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী আমদানিকারক এবং এফটিজেডে কর্মরত লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মালামালের চালানভিত্তিক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়া বা বিক্রয় না হওয়া পর্যন্ত এর মালিকানা বিদেশি সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে। মালিকানা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এসব পণ্যকে মজুত হিসেবে গণ্য করবে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো ঋণঝুঁকি গ্রহণ করবে না।
লেনদেনের ধরন স্পষ্ট করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরের ক্রেতারা এফটিজেড থেকে পণ্য কিনলে তা আমদানি হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, এফটিজেড প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয়কে বিক্রেতার জন্য রপ্তানি এবং ক্রেতার জন্য আমদানি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে যথাযথ এক্সপি ও আইএমপি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং সব অর্থ লেনদেন অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় সম্পন্ন করতে হবে।
চালানের ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্য এফটিজেডে সর্বোচ্চ ৪৮ থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। তবে বায়ার্স ক্রেডিট ও সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটসহ বিলম্ব মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থার আমদানি সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এডি ব্যাংকগুলো বিশেষায়িত অঞ্চলের ন্যায় অর্থায়ন সুবিধা দিতে পারবে এবং ওবিইউ প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়ন করতে পারবে।
এই নতুন বাণিজ্যকাঠামোর ফলে মুক্তবাণিজ্য এলাকার ব্যবসায়ীরা কোনো শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও পণ্য আমদানি করতে পারবেন। এসব অঞ্চলে পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংযোজন, পুনঃ মোড়কীকরণ (রিপ্যাকেজিং), রিলেবেলিং ও পুনঃ রপ্তানির সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধ করে দেশি বাজারেও পণ্য সরবরাহ করা যাবে। এতে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো এলসি ছাড়াই বিদেশি কাঁচামাল পাবে এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর কাঁচামালের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এফটিজেড চালু হলে রপ্তানিমুখী শিল্পসহ স্থানীয় উৎপাদনশীল খাত শক্তিশালী হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বাড়বে। এতে পণ্য রপ্তানির লিড টাইম কমবে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আধুনিক মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, এই অঞ্চল চালু হলে দেশে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হবে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, মুক্তবাণিজ্য এলাকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে একটি বৈশ্বিক হাব তৈরি করা সম্ভব হবে।